Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৬)

পরেরদিন একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠলেন ইন্টারকমের আওয়াজে। মেই ফোনে বলল, “আপনার শরীর ঠিক আছে? আপনি আজ রুমেই থাকুন। আমি ব্রেকফাস্ট টেবিল নিয়ে ওপরে আসছি।”
এলাহি আয়োজন ছিল ব্রেকফাস্টে। ছোট বাটিতে আদা দিয়ে ওয়ান্টন স্যুপ, মাংসের পিঠে, ছোট বাটিতে মেইফুন, একটা চৌকোণা অমলেট, কিছু সব্জি দিয়ে বানানো একটু ভাজা, ছোট বাটিতে ভাতের ওপর বাঁধাকপির আচার, তিলের নাড়ুর মতো দেখতে মিষ্টি।
প্রজ্ঞা দেবী বললেন, “একি! এত কে খাবে মেই?” মেই মিষ্টি হেসে বলল, “আপনি।” প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আমি তো আমিষ খাই না অনেকদিন।” পাকা গিন্নির মতো স্যুপে ফুঁ দিতে দিতে মেই বলল, “আজ খান। আপনার শরীরে জোর আসবে। মা এগুলো স্পেশালি আপনার জন্য বানাল।”
প্রজ্ঞাদেবী বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না যে তিনি বিধবা বলে আমিষ ছেড়ে দিয়েছেন। সংসারের চাপে লোকাচারের বিরোধিতা করা ঐ মেয়েটা মরে গেছে। তিনি সারাটা জীবন স্বামীর মঙ্গলকামনায় উপোষ করেছেন। অবশ্য মাঝখানে গৌতম টুক করে জল সাবু খাইয়ে দিত তাঁর হাজার বারণ সত্ত্বেও। ভক্তি করে ঠাকুরের কাছে মাথা নুইয়েছেন। মেয়ে আর ছেলেদুটোর জন্য পুজোপাঠ, জ্যোতিষের পাথর, বিয়ের আগে কুষ্ঠীবিচার কিচ্ছু বাদ রাখেননি। সারাজীবন মনে হয়েছে যদি তাঁর কৈশোর যৌবনে কেউ যদি একটা নীলার আংটি পরাত কি শ্বেতবেড়েলার মূল, তাহলে হয়ত জীবনে একটা বীভৎস দাগ থাকতো না। কিন্তু মেয়েটার মুখ চেয়ে মানা করলেন না। চুপচাপ খেয়ে নিলেন সবকটা।
মেই বলল, “একটা কথা ছিল ম্যাম, আজ কিন্তু ঝড় হতে পারে। খবরে বলেছে। সন্ধ্যের দিকে হবে। কাল আপনার ফ্লাইট ডিলে হতে পারে একটু। পারলে আজ দুপুরে মঠে চলে যান। আপনার পাশের রুমের লোকটা তো অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে ঘুরতে।” প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আচ্ছা। আজ বিকেলে শপিং ও করে নেব।”

বিকেলের পড়ন্ত বেলায় প্রজ্ঞাদেবী বাজার ঘুরে আরও কিছু গিফট নিলেন রুও আর মেইর জন্য। সারাদিন মন উচাটন হচ্ছে তাঁর। আকাশ গম্ভীর হতে শুরু করেছে। আর তাঁর মনে ঝড় চলছে কাল রাত থেকে। ৩২ বছর পর সিদ্ধার্থর সাথে দেখা হওয়াটা তাঁর এখনও হজম হচ্ছে না। কতো রাত তিনি কেঁদেছেন একটা সময়ে সিদ্ধার্থকে এক ঝলক দেখার জন্য। কত প্রার্থনা করেছেন যেন চোখ খুললে দেখেন, কোনও মন্ত্রবলে, সিদ্ধার্থ তাঁর পাশে দুষ্টুমি মাখা চোখে তাকিয়ে। কতোবার ব্যর্থ কল্পনা করেছেন ওর ঘুমন্ত মুখটা। তখন সেসব কিছুই পূর্ণ হয়নি। তাহলে আজ জীবনসায়াহ্নে কি করতে এলো সে? আইপডে গান বাজছে, “পুরনো সেইদিনের কথা।”

প্রজ্ঞা ক্লাসে বসে মন শক্ত করছে। সেদিনের পর দুদিন কেটে গেছে। কোনও লেকচার কানে ঢুকছে না। এক্সামের আর দুমাসও নেই। পাশ থেকে অসীমা ফিসফিস করে বলল, “গৌতমদার ওপর থেকে পুলিশ কেস তুলে নিয়েছে। বাড়িতে চলেও গেছে। তুই পারলে একবার দেখা করিস।”
জলে পড়ে থাকা মানুষ যেমন খড়কুটো ধরে বাঁচতে চায়, সেও সেই মুহূর্তে গৌতমকে হ্যাঙলার মতো অবলম্বন করতে চাইল। সন্ধ্যেবেলা সে যখন বাস থেকে নামলো, তলপেটর কাছে কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। মন শক্ত করতে চাইল প্রজ্ঞা একটুক্ষণের জন্য। গলার কাছটা শুকনো লাগছে তার। মনকে প্রবোধ দিল, ‘এত অপরাধবোধের কিছু নেই। গৌতম বন্ধু মাত্র। বন্ধুর কাছে সঙ্কোচের কিছু নেই।’ রাজা রাজবল্লভ স্ট্রীটের পাড়াটা চলছে নিজের তালে। বাড়ি থেকে কাঁসর ঘণ্টার আওয়াজ ভেসে আসছে। হাতে লেখা চিরকুট মিলিয়ে একটা বাড়িতে কড়া নাড়ল জোরে। উত্তেজনায় হাত কাঁপছে। একটি অল্পবয়সি স্কুলপড়ুয়া ছেলে দরজা ফাঁক করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে?” ছেলেটির চোখে সন্দেহ। পুলিশের চর নয়তো?
গলা খাঁকরে প্রজ্ঞা বলল, “নমস্কার। আমি প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র। গৌতমের জুনিয়র। দেখা করতে এসেছি একটু।”
কি ভেবে ছেলেটি বলল, “আসুন। বাইরের বৈঠকখানায় বসুন।”
কাঁপা কাঁপা পায়ে প্রজ্ঞা বৈঠকখানায় এসে বসল। সিদ্ধার্থর স্টাডির মতো বৈভব নেই; স্নিগ্ধতা আছে। ওকালতির বইও আছে সাহিত্যের পাশাপাশি। একটু পর ছেলেটি নেমে এসে বলল, “আসুন। দাদা ডাকছে ওপরে।” বড়ো একান্নবর্তী পরিবারের রাজপ্রাসাদের টানা বারান্দা পেরিয়ে যাচ্ছে সে। প্রাসাদই বটে বাড়িটা তার নিজের বাড়ির তুলনায়। দোতালার দক্ষিণের দিকের একটা ঘরে দেখল, গৌতম আধশোয়া হয়ে বসে আছে। প্রজ্ঞাকে দেখে মুখে ওর হাসি খেলে গেল। বলল, “ভাই, আমাদের একলা ছেড়ে দে একটু। দরজা টেনে দিস। অন্য কেউ যেন এখন আমাকে বিরক্ত না করে।”
ছেলেটি ঘাড় নেড়ে, দরজা টেনে চলে গেল।

প্রজ্ঞাকে বলল, “এসো। কাছে এসে বস। ও আমার জ্যেঠুর ছোটছেলে সৌরভ। আজকাল একটু কানে শুনতে সমস্যা হয়। ডাক্তার বলছে সেরে যাবে।” শুকনো মুখে প্রজ্ঞা এসে গৌতমের পালঙ্কে ওর পায়ের কাছে বসল। এই প্রথম ওর নাকে একটা অন্য রকম পুরুষালি গন্ধ এলো। দেখতে লাগলো গৌতমের শরীরটা। ব্যায়াম করা সুঠাম চেহারাতে মেদ জমেছে একটু। পাঞ্জাবির ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে একা রোমশ বুক। প্রশস্ত কাঁধের ওপর ব্যান্ডেজ জড়ানো। স্নিগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে গৌতম। নৈঃশব্দ্য ভেঙ্গে গৌতম বলল, “কি দেখছ পারুল অমন করে?”
প্রজ্ঞা চমকে তাকাল ওর দিকে। ওর স্বরে আগেও এমনি আদর মেশানো থাকতো?
সে বলল, “আমি বড্ড বোকা ছিলাম গো। তুমি জানতে সেদিন পুলিশ আমাদের মিছিলে লাঠিচার্জ করবে?”
গৌতম বলল, “হ্যাঁ। তোমার পড়া কেমন চলছে?”
শুকনো গলায় উত্তর এলো, “ভালো।”
তারপর একটা অসহ্য নীরবতা নেমে এলো গোটা ঘরে। শুধু দেওয়াল ঘড়িটা টিক টিক করে চলছে।

এমনি সময়ে প্রজ্ঞা বলে উঠল ব্যাকুল হয়ে,”আমি সিদ্ধার্থর সন্তানের মা হতে চলেছি। ওকে খবর দাও প্লিজ।”
গৌতমের মুখ দিয়ে বাক্যস্ফূর্তি হল না। অস্ফুটে বলল, “মানে?”
“সিদ্ধার্থ গত জানুয়ারির শেষের দিকে এসেছিল আমার কাছে। রাতে দেখা হয়েছিল। আমি তখনই……।”, কথা শেষ হওয়ার আগেই কাঁদতে কাঁদতে গৌতমের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল প্রজ্ঞা।
গৌতম চুপ করে বসে।
আর প্রজ্ঞা তার এতদিনের কান্না আজ উজাড় করে চলেছে।
দেওয়াল ঘড়ি একঘেয়ে সুরে টিকটিক করে চলছে। যেন মহাকালের প্রতিনিধি হয়ে ওদের সাক্ষী থাকছে। এমনি করে ঢং ঢং করে আটটা বেজে উঠল।
গৌতম বলল, “তুমি জানো সিদ্ধার্থ কোথায়?”
প্রজ্ঞা চোখ তুলে তাকাতেই বলল, “ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে ও ধরা পড়ে মালদায় গঙ্গা পেরতে গিয়ে। নক্সালের খাতায় নাম লিখিয়েছিল বহুদিন। আমরা জানতাম না। ওকে ওইদিন পুলিশে খুব মারে। তারপর কলকাতায় চালান করা হয় ওকে। ওর বাবা আইন ঘেঁটে, মুখ্যমন্ত্রীকে ধরে, ওকে রাজসাক্ষী করে বিদেশে পাঠায় গত মাসে। খুব সম্ভবত ও এখন প্যারিসে। ওকে ওখান থেকে অগাস্টে বার্লিনে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যতদিন না রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় ও ফিরবে না।”
প্রজ্ঞা স্তম্ভিত হয়ে সব কথা শুনে যাচ্ছিল। গৌতমের কথা গুলো যেন কান কেটে ওর মস্তিস্কে ঢুকছিল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল, “কি বললে?”
গৌতম বলল, “আগামী পাঁচবছরের আগে ও ফিরবে না। পিএইচডি শেষ করে ফিরবে।”
হঠাৎ প্রজ্ঞার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। এই স্বার্থপরের জন্য ও নিজের সম্ভ্রম খুইয়েছে? এই লোকটাতে সে ভালবেসেছে? এর জন্য নিজের পড়াশুনো বিসর্জন দিতে বসেছিল? ঘোর লাগা গলায় বলল, “আমি ডাক্তারের কাছে যাবো এখনই। আমি এই সন্তানকে চাই না। হয় এ শেষ হবে নয়তো আমি।”
প্রেতিনীর মতো উন্মত্ত হয়ে প্রজ্ঞা দরজার দৌড়ে যেতেই গৌতম ওকে পেছন থেকে আটকায়। জাপটে ধরে নিজের মধ্যে। প্রজ্ঞার মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে, “পারুল আজ বাড়ি যাও লক্ষ্মীটি। ঠাণ্ডা হও। আর একটি মাস সময় দাও আমাকে। তোমার অসম্মান হতে দেব না। তুমি শুধু পরীক্ষাটা দিয়ে দাও মন দিয়ে। ”

সে রাতে সৌরভ ট্যাক্সি করে প্রজ্ঞাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। এক মাস পর গৌতম ওর বাড়িতে নিজে এসে বিবাহ প্রস্তাব দেয়। তখন ওর রোজগার বলতে দুটো টিউশনি। দাদাদের অমতে, গৌতমের বাড়ির বিরোধিতার মাঝেও গৌতম তাকে বিয়ে করে। বিয়ের কয়েক মাস পরই ফলপ্রকাশ হয়। প্রজ্ঞা ক্লাসে প্রথম হয়। তাকে গৌতম ভর্তি করে মাস্টার্সে । আর তার মাস ছয়েক পর সে জন্ম দেয় এক ডাকসাইটে সুন্দরী শিশুকন্যার। প্রজ্ঞার মতো পটলচেরা চোখ আর সিদ্ধার্থর মতো টিকালো নাক।
মেয়েকে কোলে নিয়ে ক্লান্ত স্বরে সে বলে, “সঙ্ঘমিত্রা।”
গৌতম শুধোয়, “ও কি তাই চেয়েছিল?”
ঘুম জড়ানো স্বরে সে বলে, “হ্যাঁ।”
মেয়েকে কোলে গৌতম উচ্ছ্বাসে বলে ওঠে, “সঙ্ঘমিত্রা বসু। আমাদের প্রথম সন্তন। এই বাড়িতে প্রথমসন্তান মেয়ে কোনোদিন হয়নি। এ আমাদের লক্ষ্মী।”

সত্যই সে লক্ষ্মী। তার জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গৌতম পাশেই একটা স্কুলে চাকরি পায় ভূগোলের শিক্ষকের। শুধু সৌন্দর্য আর ভাগ্যের জোরে তার জন্মের অবৈধতার কথা চাপা পড়ে যায় ক্রমশ। সে তার বাকি দুই ভাইয়ের থেকে অনেক মেধাবী, অনেক যোগ্য। সে তার বাবার গর্বের বস্তু। গৌতমের মাত্রাছাড়া প্রশ্রয়ে বড্ড স্বাধীনচেতা হয়েছে সে।
অথচ তাকে নিয়ে প্রজ্ঞার অস্বস্তি কোনোদিন যায়নি। কিসের এত অহঙ্কার ছিল গৌতমের, নিজের স্ত্রীর অবৈধ সন্তান নিয়ে? কি প্রমাণ করতে চাইত? সে মহান? নাকি বন্ধুর প্রতি কর্তব্য? অস্বস্তি আজও পিছু ছাড়েনি তাঁর। জানলা দিয়ে দেখলেন আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। হাল্কা করে ঠাণ্ডা হাওয়া দিতে শুরু হয়েছে।

আগামী পর্বে সমাপ্য (Next part will be the last part)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৫)

সে রাতে কিছুতেই ঘুমোতে পারলেন না প্রজ্ঞাদেবী। এভাবেও মানুষ ফিরে আসে? ৩২ বছর পরে? তাঁর আইপডে গান বাজছে, ‘আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী’।
১৯৭৩ সালে মানু রায় ক্ষমতায় চলে এসেছে। নক্সাল আন্দোলন তখন তুঙ্গে। পুলিশ রোজ শুটআউট করছে। প্রবীরের লাশ উদ্ধার হল গড়ের মাঠ থেকে। সুনিতা ইন্টারোগেশনের চোটে পাগল হয়ে গেছে। কলেজের দেয়ালে পোষ্টার পড়ে, ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান।’ প্রজ্ঞা সব কিছুতে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। সে ততদিনে ফাইনাল ইয়ার স্টুডেন্ট। আজ ৪ মাস সিদ্ধার্থের দেখা নেই। রাগ জমে। অভিমানে ওর গলা বুজে আসে।
“দ্যাখো পারমিতা। অতো ভেব না। ও এরমই ক্ষ্যাপাটে বরাবর।”, চায়ে চুমুক দিতে দিতে গৌতম বলে।
“কিন্তু এরমভাবে না বলে উধাও হওয়াটা কোন দেশি সভ্যতা গৌতম?”, প্রজ্ঞা বিরক্ত। কফি হাউসে মান্না দের গান বাজছে।
“দ্যাখো পারমিতা, তোমার পড়াশুনোয় মন দাও। সেকেন্ড ইয়ারে ৫০% মার্কস তুলেছ। এগুলো কি হচ্ছে?”
“সে তোমায় নিতে হবে না। কিন্তু মানু রায়ের টর্চারও নেওয়া যায় না।”
“নিতে হবে না। তুমি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িও না। এটা ফাইনাল ইয়ার। প্লিজ, ৬০% র ওপর মার্কস আনো।”
“ছিঃ গৌতম! তুমি বামপন্থী হয়েও আমাকে বলছ শ্রেণীশত্রুকে পিঠ দেখাব?”, প্রজ্ঞার গলায় ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে।
“হ্যাঁ, বলছি। তুমি মেধাবী। আমি চাই না গড়ের মাঠ থেকে তোমারও লাশ উদ্ধার হোক। আমি চাইনা তোমার মেধাটা নষ্ট হোক।”, অজান্তে গৌতমের গলাটা চড়ে যায়।
“অসভ্যের মতো চেঁচিয়ো না গৌতম।”, প্রজ্ঞারও গলাটা ওঠে।
“তুমি এই রোববারের মিছিলে যাবে না; ব্যাস।”, ছায়ের কাপটা নামিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে গৌতম।
“তুমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কে?”, প্রজ্ঞা উদ্ধত হয়ে ওঠে।
“আমি ইউনিয়ন লিডার, কমরেড গৌতম বসু।”, রায় শুনিয়ে দেয় সে।
থম্থমে মুখে প্রজ্ঞা বসে থাকে। কফি জুড়িয়ে যায়। ফিশফ্রাই ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

সেই রোববারটা ছিল অসহ্যরকম দীর্ঘ। খবর এসেছিল, রাইটার্সের সামনে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। লাঠি চার্জ, জলকামানও চালানো হয়েছে মিছিলের ওপর; যে মিছিলের পুরোভাগে ছিল গৌতম। দাদারা তাকে ঘরবন্দী রেখেছিল। সারাদিন প্রজ্ঞা ছটফট করেছে। সিদ্ধার্থ নেই পাশে। যদি গৌতমের কিছু হয়? পরেরদিন খবর কাগজে বেরোল সেই মিছিলে ১০ জন নিহত, ৩০ জন গুরুতর আহত। আহতরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি। গৌতমের রক্তাক্ত ছবি ছিল প্রথম পাতায়। প্রজ্ঞা আছন্নের মতো ক্লাসরুমে বসে থাকে। গৌতম তাকে এভাবে বাঁচালো?!
ক্যান্টিনে অনীশ এসে খবর দেয়, “প্রজ্ঞাদি, গৌতমদা ভালো আছে মোটামুটি। খবর পেয়েছি।”
প্রজ্ঞা ওর হাত চেপে ধরে বলে, “আমাকে নিয়ে চল।”
অনীশ বলল, “পাগল নাকি? গেলেই সাদা পোষাকে থাকা পুলিশ ধরবে। তুমি আজ বাড়ি যাও।”
সেই মুহূর্তে বড়ো শীত করছিল প্রজ্ঞার; বড়ো অসহায় বোধ করছিল ও।

এই ঘটনার পর একমাস কেটে গেছে। সে বড়ো শান্ত হয়ে গেছে। প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরিয়ে নিয়েছে নিজেকে।কেবল উদ্বাস্তুদের সাহায্য করাটা বন্ধ করেনি। গৌতম হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে গেছে। কিন্তু ওর ঘোরাফেরা বারণ। নক্সাল সন্দেহে প্রায়ই পুলিশের চর সাদা পোষাকে ওদের গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। সিদ্ধার্থর সাথেও তেমন দেখা হয় না। সর্বদা ও যেন ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত। ওর বাবা শাসক ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ছেলের অবাধ ঘোরাফেরায় বাধ সেধেছেন। নক্সালদের লিস্টে বাপ-বেটার নাম ওঠার ভয় তো আছেই। মাঝে মাঝে নিজের ডেস্কে অনামি খামে সিদ্ধার্থর চিঠি পায়। কিন্তু তাকে এখন আর কিছুই স্পর্শ করে না। ওর সামনে পরীক্ষা । গৌতমতো এটাকেই তো পাখির চোখ করতে বলেছিল। মাঝে মাঝে একা ঢাকুরিয়া লেকে বসে থাকে। সিদ্ধার্থর মুখটা আবছা হয়ে যাচ্ছে কি? ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে মাঝে মাঝে। ওর শরীর উন্মুখ হয়ে থাকে সিদ্ধার্থর ছোঁয়ার আশায়। মনে পড়ে সিদ্ধার্থর ঘামে ভেজা গায়ের গন্ধটা, ওর চোখ, ওর টিকালো নাক; সর্বোপরি ওর আগুনের মতো সর্বগ্রাসী ভালোবাসাটা। সব মিলিয়ে গেছে ওর জীবন থেকে। প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র স্তিমিত হয়ে গেছে।

ক্রমে সময় কেটে যায়। আরও ৪ মাস অতিক্রান্ত। সংসার বড়ো হয়েছে। বড়দার স্ত্রীবিয়োগ হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুকালে একটি ছেলের দায় চাপিয়ে গেছেন। মেজদা ও সেজদার একমাসের ব্যাবধানে পর পর বিয়ে হল। ছোড়দা চলে গেছে বম্বে চাকরি নিয়ে। প্রতিমাসে নিয়ম করে খামে করে টাকা আসে। বাবারও অবসরের সময় হয়ে এল। সব কথা ভেবেই টালিগঞ্জের বাড়িটা দোতালা করা হয়েছে সদ্য। এখনও বাইরেটা চুনকাম করা বাকি। প্রজ্ঞার পড়ার কথা ভেবে ছোড়দার পরামর্শে ছাদে একটা সুন্দর শৌখিন ঘর বানানো হয়েছে। প্রজ্ঞা পারতপক্ষে ঘর ছেড়ে বেরয় না। গ্র্যাজুয়েশনের পর সে কি করবে ভাবতে থাকে। সেজদার শ্বশুরবাড়ির দিকে কয়েকটা সুযোগ্য পাত্র আছে। সিদ্ধার্থর তরফে আর কোনও যোগাযোগ নেই। এমনি এক শেষ জানুয়ারির রাতে প্রজ্ঞার দরজায় টোকা পড়ে। ঘড়িতে তখন রাত ১১ টা। সে অবাক হয়। ভাবে মেজবৌদি যদি এই সময় যদি রসের গল্প করতে আসে তাহলে সে দুকথা শুনিয়ে দেবে। এসব সাত পাঁচ ভেবে দরজা খুলতেই চমকে উঠল ও।

একি সামনে কে দাঁড়িয়ে? সিদ্ধার্থ না? একি চেহারা হয়েছে? একমুখ দাড়ি। মাথার চুল রুক্ষ হয়ে গেছে অযত্নে। গায়ের রঙ পুড়ে গেছে পুরো। জামা কাপড় শতচ্ছিন্ন। স্তব্ধ হয়ে গেল প্রজ্ঞার হৃদয়। আচমকা ওকে জড়িয়ে ধরে সিদ্ধার্থ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে। কানে কানে বলে, “কিছু খেতে দিতে পারবে গো? চারদিন ধরে শুধু জল আর মুড়ি খেয়ে আছি।” চোখ ফেটে জল এল প্রজ্ঞার। অতো বড়লোক বাড়ির অতো আদরের ছেলে আজ এতদিন অভুক্ত। বলল, “দাঁড়াও একটু।” সিদ্ধার্থ ওর হাত ধরে বলল, ” শোনো, আস্তে করে যেও। তোমার পাশের বাড়িতে পুলিশের চর এসেছে আজ ৭ দিন।” প্রজ্ঞার বুক হিম হয়ে যায় শুনে। আস্তে আস্তে করে নিচের রান্নাঘরে নেমে মিটসেফ খুলে পায়, রুটি, একটু তরকারি, অল্প ডাল আর দুটো অমৃতি। তাইই নিয়ে ছাদে উঠে আসে সে। গোটা পাড়াটা শীতে নিস্তব্ধ। কেউ জেগে নেই। বুভুক্ষুর মতো সিদ্ধার্থ তাই খেল পশুর মত। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে প্রজ্ঞা বলল, “ধীরে ধীরে খাও।”
সিদ্ধার্থর খাওয়া হলে ঐ থালাতেই আঁচিয়ে দিল। হঠাৎ বাইরের রাস্তায় কারুর পায়ের আওয়াজ মনে হতেই প্রজ্ঞা চট করে আলো নিবিয়ে দিল। হারিকেনের শিখাটা খুব কমিয়ে দিয়ে সিদ্ধার্থের মুখটা নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে দিল। স্পষ্ট বুঝতে পারছে সে, সিদ্ধার্থ ভয়ে কাঁপছে। এমনি করে কিছুক্ষন কাটার পর প্রজ্ঞা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। হারিকেনের আলোয় সিদ্ধার্থ দেখতে পেল, এক অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারিণী তার প্রেমিকা। সে রূপ অসম্ভব স্নিগ্ধ, অসম্ভব পবিত্র। তার মনে হল সে যদি তার প্রেমিকাকে ছোঁয়, হয়ত তার পাপ হবে। তাও সে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর। আজ রাতটুকুই তো সম্বল। তারপর যদি দেখা না হয়? প্রাণপণে ওর ঠোঁট থেকে শুষে নিতে থাকল প্রাণশক্তি, “আহ মিতা, তোমাকে কতদিন পাইনি কাছে।” প্রজ্ঞার আঁচল মাটিতে লুটোচ্ছে। সিদ্ধার্থ নগ্ন মুহূর্তকালে। সে বুঝতে পারছে, পিঠে আঁচড় কাটছে প্রেয়সীর নখ। সে আরও কাছে চেপে ধরে তাকে। আরও কাছে টেনে আনে। দুটো শরীরে শঙ্খ লাগে প্রথমবার, নিঃশব্দে।
রমণ শেষে প্রজ্ঞার এলোচুলে আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে সিদ্ধার্থ বলে, “মিতা, সরি।”
প্রজ্ঞাপারমিতা ভেজা গলায় বলে, “এতদিন কোথায় ছিলে তুমি?”
“আমি পার্টির নির্দেশে উত্তরবঙ্গে ছিলাম। বাড়ির সাথে সম্পর্ক নেই আর। আমার ওপর নির্দেশ আছে অনেক কাজের। মিতা কথা দাও অপেক্ষা করবে।”
“না যেও না সিদ্ধার্থ। আমি এখানে একলা। বড্ড একলা।”, প্রজ্ঞার গলায় আকুতি ঝরে পড়ে।
আলতো হেসে সিদ্ধার্থ বলে, “কেঁদো না লক্ষ্মীটি। গৌতম তোমাকে আমার সব খবর দেবে।”
“না তোমাকে চাই শুধু। এ লড়াইয়ে কোনও দিশা নেই। তোমাকে আমি হারাতে পারব না।”
“আমি ঠিক ফিরে আসব। কথা দিলাম। এখন একটু ঘুমাও।”

সেটা ছিল ওদের শেষ দেখা। তারপর সিদ্ধার্থ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। ক্রমশ এপ্রিলের শেষ এগিয়ে আসে। পরীক্ষার চাপ বাড়তে থাকে। সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে ওর অম্বল আর অরুচি। এসবের জন্য ওর মা দায়ি করে রাতজাগা আর পড়ার চিন্তাকে। এসবের মাঝে একদিন ক্লাসে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায়। সাথে উঠে আসে প্রচুর বমি। একটু সুস্থ হলে ইউনিয়নের একটি মেয়ে এসে বলে, “দিদি, আমার লক্ষন ঠিক লাগছে না। তুমি কি কারুর সাথে? মানে তুমি তো বিয়ে করনি। কথাটা খুব লজ্জার কিন্তু।” প্রজ্ঞার সময় লাগে কথাটা বুঝতে। তারপর পিঠ দিয়ে হিমস্রোত বয়ে যায়। একি কথা শুনছে সে? সে হাসবে না কাঁদবে? সে কুমারী মেয়ে আবার পেটে বাসা বেঁধেছে সিদ্ধার্থর সন্তান ! কি করবে সে?

ক্রমশঃ (To be continued)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৪)

১৯৭২ সাল; প্রজ্ঞা সেকেন্ড ইয়ারে, গৌতমের ফাইনাল ইয়ার। সিদ্ধার্থ পাশ করে বেরিয়ে গেছে। ক্রমশ সিদ্ধার্থ অনুপস্থিত হতে থাকে ইউনিয়ন মিটিঙে, চিত্রা সিনেমার শোতে, ভিক্টোরিয়ার লেকে, কফি হাউসে। কমরেড গৌতম বসু তখন সামলায় কলেজ ইউনিয়ন ওর অনুপস্থিতিতে। আর হয়ে ওঠে প্রজ্ঞার বন্ধু, আশ্রয়দাতা। প্রজ্ঞার রাজনীতি করা নিয়ে বাড়িতে অশান্তি হয় প্রায়ই। বাবা মা চায় না গেরস্ত বাড়ির সোমত্ত মেয়ে এভাবে ছুটে বেড়াক। রক্ষে একটাই, প্রবল কংগ্রেসি বাড়ির গৃহকর্তা জানেন না যে কন্যাটি বিপক্ষ দলের সমর্থক। তাও হয়তো মেজ আর সেজ দাদার প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছিল বলে প্রজ্ঞা বাড়তে থাকে। বাড়ির লোক মুখ বুজে মেনে নেয়। কেই বা চায় রোজগেরে ছেলেদের চটাতে! বাংলায় অরাজকতা বাড়তে থাকে। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের দিকে হাওয়া ঘুরছে ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে কার্ফু ঘোষণা হয়ে যায়। প্রধান বিরোধী নেতা হিসেবে জ্যোতি বসু ভীষণ জনপ্রিয় যুবসমাজে। শহরতলির দিকে নক্সালদের আতঙ্ক প্রবল। এই সময়ে শ্লোগান উঠল, ‘পুলিশ তুমি যতই মারো। মাইনে তোমার একশো বারো।’ কলেজে খবর আসতে থাকে রোজ কেউ না কেউ গ্রেফতার হচ্ছে। ধীরে ধীরে সুবীর, সুনিপ, প্রমীলা, গীতা, অতিন, শম্পা; মেধাবী ছেলেমেয়ে গুলো নক্সাল হয়ে যায়। তারপর একদিন গ্রেফতার হয়ে যায় মাঝরাতে। তারপর? তারপর গড়ের মাঠে দৌড়াতে দৌড়াতে ওরা পৃথিবী থেকে মুছে যায়।

তাও এই ঝড়ের মাঝে সিদ্ধার্থ আর প্রজ্ঞা নিভৃত খুঁজে নেয় সিদ্ধার্থর স্টাডি রুমে। বৃষ্টির দিনে দুটো শরীর উষ্ণতা খুঁজে নেয় একে অপরের সান্নিধ্যে। চুমুতে চুমুতে হারিয়ে যায় ওরা। এমনি একদিন মাতাল করা দিনে দুজনে এলোমেলো বিছানায় শুয়ে ছিল। প্রজ্ঞার নগ্ন পিঠে সিদ্ধার্থ আঙ্গুল বোলাচ্ছিল।
প্রজ্ঞা জিজ্ঞেস করল, “কি আঁকছ অমনি করে আঙ্গুল বুলিয়ে?”
চোখের কোণে হাসি ফুটিয়ে সিদ্ধার্থ বলল, “তোমাকে।”
ক্ষণিক নিস্তব্ধ থাকার পর প্রজ্ঞা আবার বলে উঠল, “সিদ্ধার্থ।”
অস্ফুটে সিদ্ধার্থ বলল, “উঁ?”
“তুমি আমায় ভালবাস?”, প্রজ্ঞার গলায় সঙ্কোচ।
“নাঃ। একদমই না।”, সিদ্ধার্থ দুষ্টুমি করে প্রজ্ঞার নাক টিপে দেয়।
“আঃ, সিরিয়াসলি বলো না।”, প্রজ্ঞার গলায় চাপা বিরক্তি।
মুহূর্তে প্রজ্ঞার পাখির মতো হাল্কা শরীরটা নিজের ওপর তুলে নিয়ে সিদ্ধার্থ বলে, “বাসি। ভীষণ।”
“তাহলে তুমি কোথায় উধাও হয়ে যাও আমাকে না বলে?”, প্রজ্ঞার গলায় অনুযোগের সুর।
প্রজ্ঞার ছুল গুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিয়ে সিদ্ধার্থ বলে, “যাই, এক জায়গায়। বলা যাবে না। মন্ত্রগুপ্তি।”
“সিদ্ধার্থ!”। ডুকরে ওঠে প্রজ্ঞা।
“এই বোকা একদম কাঁদে না। না।” সিদ্ধার্থ কামড়ে ধরে প্রজ্ঞার তোলার ঠোঁট, “মিতা। তুমি শুধুই আমার। তোমাকে ছেড়ে আমি কোথায় যাবো?”
“হুহঃ তোমার জীবনে আবার মেয়ের অভাব?!”, সদ্য কৈশোর পেরোনো প্রজ্ঞার গলায় অভিমান টের পায় সিদ্ধার্থ। প্রেয়সীর মনে প্রলেপ দিতে বলে ওঠে, ” তা বলতে পার। তবে তারা কেউ আমাকে ডিবেটে হারায়নি। আমার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উদ্বাস্তু কলোনির কাজে সাহায্য করেনি।”
প্রজ্ঞা আঁকড়ে ধরে প্রেমিকে, “আমার বড়ো ভয় করে গো।”
“কিসের?”, স্নেহাচ্ছন্ন গলায় বলে সিদ্ধার্থ।
ভীরু হরিণীর মতো চোখে প্রজ্ঞা বলে, “আমাদের ভালোবাসা ফসিল হয়ে যাবে।”
“ধুর পাগল।”, অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে সিদ্ধার্থ, “একবার এই বুর্জোয়া সরকারটা উলটে যাক। আমাদের সন্তানকে নতুন পৃথিবী দেখাব আমি।”
“সত্যি?”, প্রজ্ঞার চোখে খুশি উপচে পড়ে।
“হ্যাঁ গো। আমি ঠিক করেছি, ছেলে হলে নাম দেব দেবাদৃত আর মেয়ে হলে নাম দেব সঙ্ঘমিত্রা। এবার তোমার কাকে চাই?, সেই দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকায় সে প্রজ্ঞার দিকে।
“ধ্যাত! অসভ্য।” এই বলে সিদ্ধার্থর ঠোঁটদুটো চেপে ধরে সে। আবেগে ভেসে যায় দুজন।

ঘড়িতে প্রায় সাড়ে ৯টা বাজে। মেইর দেরি হওয়াতে বিরক্ত হচ্ছেন প্রজ্ঞাদেবী। ডিনারটাইম পার করে খাওয়াটা তার পছন্দ কোনোকালে না। মঠটাও আস্তে আস্তে খালি হচ্ছে। আইপডটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ান।হঠাৎ কানে আসে তাঁর, “মিতা তুমি?”
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই ভূত দেখার মত চমকে ওঠেন তিনি। ভুতই তো! নিজের হাতে কবর দেওয়া পুরনো জীবন যদি আবার বর্তমানে হানা দেয়, তো সেটা ভূত না? স্পষ্ট দেখলেন, মেইডেন হেয়ার গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সিদ্ধার্থ। সেই সুপুরুষ চেহারা। বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে ঠিকই। মধ্যপ্রদেশ ঈষৎ স্ফীত। চুল আর দাড়িতে পাক ধরেছে। কিন্তু চোখদুটো আগের মতই ঝকঝকে। হাতে একটা ক্যামেরা ধরা তাঁর।
“সিদ্ধার্থ!”, অস্ফুটে মুখ দিয়ে বেরল তাঁর। ৩২ বছর পর আবার মুখোমুখি দুজনে।
অবাক চোখে সিদ্ধার্থবাবু দেখতে থাকেন তাঁর একদা প্রেয়সীকে। সোনাঝরা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সাদা তাঁতের শাড়ি পড়ে। গায়ে একটা শাল জড়ানো। সিঁথির দুদিকের চুলে পাক ধরেছে। চামড়া কুঁচকে গেছে কিছুটা। শুধু শুন্য সিঁথিটা বুকে ধাক্কা মারল ঠিকই আবার কৌতূহলও জাগাল অনেক।
কয়েকমুহূর্ত যেন সময় থমকে ছিল। তারপর প্রজ্ঞাদেবীর ভেতর থেকে যেন একটা বিস্ফোরণ বেরিয়ে আস্তে চাইল। বেরিয়ে আস্তে ছাইল অনেকদিনের জমানো রাগ, দুঃখ, হতাশা।উহ! কি স্পর্ধা লোকটার! সাহস হল কি করে ‘মিতা’ বলে ডাকতে? কিন্তু তিনি উত্তর দেওয়ার আগেই মেই চলে এল।
“মাফ করবেন ম্যাম। একটু দেরি হয়ে গেল। চলুন এখন, কাল আবার আসব।”, মেই এসে ওনার হাত ধরে নিয়ে চলে গেল ওদের বাড়ি।

ক্রমশঃ (To be continued)