Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ২)

সঙ্ঘমিত্রা তার মায়ের বেরানোর প্ল্যানটা ভালোই বানিয়েছিল। তবে অক্টোবরে কোলকাতার দুর্গাপুজো ছেড়ে কে যেতে চায়? তায় সময়টা ২০১০ সাল। তখনতো স্মার্টফোন সবে ঢুকেছে বাঙ্গালীর ঘরে। বিএসএনএল, এয়ারটেল ছাড়া তেমন কোনও ভালো সার্ভিস প্রোভাইডার নেই। ৪ জি ইন্টারনেট দূরঅস্ত ব্যাপার। জয় এসে প্ল্যান বোঝাল, “দেখুন মা, বেইজিংএ থাকবেন ৭ দিন। ওখানে আমার পুরনো বন্ধু থাকবে। ওর নাম দীপ্ত। ও আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দেবে আর ওইই গাইড এনে দেবে আর আপনার সাথে থাকবে।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “বাবা, ফরবিডেন সিটি ঘুরতেই তো ২ দিন লেগে যাবে।”
জয় বলল, “লাগুক না। তার পরের দিন, টেম্পল অফ হেভেন, জিংশান পার্ক, প্যালেস মিউসিয়াম ঘুরে নেবেন। আর বার্ডস নেস্ট স্টেডিয়ামটা মিস করবেন না”
তড়বড় করে মিত্রা বলে উঠল, “অতো ডিরেকশন দিতে হবে না মাকে। তুমি দীপ্তকে বলে দিও মা ওর কাছেই খেয়ে নেবে।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “ও মা! আমি তো চাইনীজ খাই রে মুনু।”
মিত্রা বলল, “আমরা বঙ্গ-চৈনিক ভার্সান খাই মা। ওথেন্টিক চীনে খাবার নাও খেতে পার তুমি।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “মুনু, আমি একলা যাবো না, ভয় করছে।”
মিত্রা বলল, “ভয় কাটাও মা। তুমি যাচ্ছ, আর হ্যাঁ পারলে আমার জন্য একটা ভালো হেয়ার পিন এনো তো।”
জয় বলল, “দীপ্তর বাড়ি থেকে আপনি কল করে নেবেন আমাদের। ওদের টাইম আড়াই ঘণ্টা এগিয়ে। আপনি ওদের লোকাল টাইম রাত সাড়ে ১০ টাতে ফোন করে নেবেন। চিন্তা করবেন না মা।”

একমাস ধরে এইসব প্ল্যানিং করে, মহালয়ায়ার আগের দিন, সুটকেস গুছিয়ে কোলকাতা বিমানবন্দরে সন্ধ্যেবেলা ওরা পৌঁছাল। মিত্রার ছেলে বাবুই দিদার আঁচল ধরে কতো কথা বকে যাচ্ছে। রাহুল মায়ের নতুন অ্যাডভেঞ্চারের কথায় লাফিয়ে উঠলেও রাতুল বিরক্ত মিত্রার কাণ্ডজ্ঞানহীনতায়। এই নিয়ে মিত্রার সাথে তার বেশ ঝগড়া হয়ে গেছে। বোঝাই যায়, উত্তর কোলকাতার গলি ছেড়ে তুস্কানি উড়ে গেলেও, কিছু লোক তার পূর্বপুরুষের গোঁড়া সংস্কার থেকে বেরতে পারে না। আবার মিত্রাও বুঝতে চায় না, সে ঘোড়ায় জিন দিয়ে থাকে বলে, যে সবাই থাকবে এমন কথা কোথাও লেখা নেই। তারপর, সাড়ে ১৭ ঘণ্টার উড়ান শেষে প্রজ্ঞাদেবী যখন বেইজিং বিমানবন্দরের বাইরে এলেন ,সত্যি বলতে কি; শরীর টানছিল না তাঁর। ভাগ্যক্রমে, দীপ্ত আগে থেকে উপস্থিত ছিল। সে তাঁকে নিয়ে হোটেলে গিয়ে চেক ইন করিয়ে দিল। যাওয়ার সময় বলল, “মাসিমা, ঘুমান। শরীর ঠিক লাগলে, রিসেপশন থেকে আমাকে একটা ফোন করে নেবেন।” বলে একটা প্রণাম করে সে চলে গেল। শুয়ে শুয়ে প্রজ্ঞাদেবী ভাবতে লাগলেন, “গতকাল মহালয়া ছিল। রাহুল রাতুল কি তর্পণ করেছে তাদের বাবার উদ্দেশ্যে? বেঁচে থাকতে মানুষটা খেতে কতো ভালবাসত। চা, বেলের পানা, ঘোল, লস্যি, ফলের রস, জলজিরা- মোদ্দা কথা, তেষ্টা নিবৃত্তির কোনও জিনিস বাদ রাখেননি। আর আজ প্রেতলোকে কি তিনি উপোসী, তৃষ্ণার্ত?”

পরের দিন প্ল্যানমতো দীপ্ত এল আর তার সাথে এল একটি মেয়ে। দীপ্ত বলল, “মাসিমা, এই হল লু মেইহুয়া। আমরা বলি মেই। আমার সাথে ও মিউসিয়ামে কাজ করে। ও আমাদের বেইজিংটা ঘোরাবে।” সাতসকালে এমন এক অনাহুতকে দেখে প্রজ্ঞাদেবী ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “বাবা দীপ্ত, আবার অন্য মানুষ কেন? আমরা দুজনেই তো ঠিক ছিলাম।” দীপ্ত হেসে বলল, “চিন্তা করবেন না। মেই প্যালেস মিউসিয়ামের রেজিস্টার্ড গাইড। ও ভালো ইংলিশ বলে।” মেই হেসে এগিয়ে এসে বলল, ” আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম। অনেক গল্প আমি জানি, বইয়ের পাতার বাইরের। আপনার মজা লাগবে।” পরবর্তী ৭ দিন মেই ভালোই ঘোরাল। সে নিজেও চিং সাম্রাজ্য নিয়ে পড়াশুনো করেছে। ফরবিডেন সিটির এত গল্প জানে, যে সব বলতে গেলে আর একটা ভ্রমণকাহিনী হয়ে যাবে। মেই যখন জানল প্রজ্ঞাদেবী ইতিহাসের গবেষক এবং শানক্সির মেইডেন হেয়ার গাছ দেখতে এসেছেন, সে তো খুশি হয়ে বলেই দিল, ” চানগান থেকে কাছে পড়বে গাছ টা। ওখানেই আমাদের বাড়ি। আপনি আমাদের গেস্ট। আমি মাকে বলে দেব।” প্রজ্ঞাদেবীর কোনও ওজর আপত্তি চলল না। অতঃপর অষ্টমীর দিন ওনারা শানক্সির চানগানের দিকে চললেন। দীপ্ত রয়ে গেল বেইজিঙে। প্রজ্ঞাদেবীর মন পড়ে কলকাতায়। বছর পাঁচেক আগেও এইদিনে কতো হইচই হত। রাহুল, রাতুল, মিত্রা, বউমা, জামাই, নাতি-নাতনি নিয়ে জমজমাট সংসার হত পুজোর কটা দিন।

চানগানের লুয়ানঝেনে মেইর বাড়ি। ওর মা গাও রুও থাকে শুধু বাড়িতে। কাঠের বেশ বড়ো একটা তিনতলা বাড়ি। একতলায় একটা রেস্তরা চালায় রুও। দোতলায় মা মেয়ের থাকার জায়গা। আর তিনতলায় দুটো বড়ো রুম, সামনে খোলা ছাদ সুদ্ধ। প্রতিটি রুমে সুন্দর করে গোছান। রুও বলেই দিল, “আমি ভালো করে রান্না করে দেব। আপনার যা দরকার ইন্টারকমে বলে দেবেন।” ব্যবস্থাটা বেশ সুন্দর। প্রজ্ঞাদেবী বেশ অভিভূত হলেন এরমধারা থাকাতে। মনে পড়ে, গৌতম যখন ঘোরাতে নিয়ে যেত, তুলোয় মুড়ে রাখত তাকে। বাড়ির অন্য বউরা আড়ালে বলত, “আদিখ্যেতা।” আজ যদি লোকটা জানত তার আদরের পারুল এরমভাবে অন্যকারুর ঘরে থাকছে, অনর্থ করে দিত। তাং সাম্রাজ্যের ওপরও বেশ দখল আছে মেয়েটার। শানক্সির ৬ দিন ওনার মনটাকে ভুলিয়ে দিল পুরো। মেই ওনাকে তাংদের ঐতিহাসিক স্থান দেখায়। রুও ওনাকে ডাম্পলিং বানানো শেখায়। তিল তেলে মিষ্টি ভাজে দুজনে। যদিও এই ঘরে হোটেলের বৈভব নেই, তবে আরাম আছে। কলেজে মার্ক্সবাদে এসবই ওদের প্রভাবিত করত না? মেই আর রুও বলেছে একদম পূর্ণিমার দিন মেইডেন হেয়ার গাছ দেখতে যেতে।

প্রজ্ঞাদেবীর এই প্রথম যেন মনে হচ্ছে তিনি ছুটি কাটাচ্ছেন। কোনও তাড়া নেই সাইট সিএংর। কোনও তাড়া নেই বার বার ছবি তোলার। কোনও চিন্তা নেই তিনটে সন্তানকে আগলাবার। হয়তো দশমীতে মায়ের বিসর্জনের সাথে সাথে বসুদের বাড়ির বড়ো বউয়েরও বিসর্জন বোধহয় হয়ে গেছে। মৈত্র বাড়ির ছোট মেয়েটাও বিসর্জিত অনেকদিন। তিনি শুধু প্রজ্ঞাপারমিতা এখন। আজ তো আবার বিকেলে রুও দোকান বন্ধ করে শপিং করাতে নিয়ে গেল। ঝুড়ি ঝুড়ি জিনিষ কিনলেন দুজনে মিলে। আজ ওনার খরচের হিসেব নেওয়ার কেউ নেই। রাতের বেলা ফিরে দেখেন দুজনে দরজার সামনে একজোড়া জুতো। পুরুষমানুষের। অপরাধী মুখ করে মেই জানায় একজন বয়স্ক লোক এসেছেন আমেরিকা থেকে। প্রজ্ঞার পাশের রুমে। রুওকে আশ্বস্ত করে প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আহা, কোনও অসুবিধে নেই। আমি তো আর দুদিন পর দেশে ফিরে যাবো। তোমরা শুধু কাল একটা গাড়ি দেকে দিও মেইডেন হেয়ার যাবার জন্য।” রাতে শোয়ার সময় একটা চাপা অস্বস্তি হল তাঁর। লোকটার উপস্থিতি ঠিক ভালো লাগছে না তাঁর।

ক্রমশঃ (To be continued)