Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ১)

“পারুল”, কাঁপা কাঁপা গলায় গৌতমবাবু ডাকলেন।
উল বুনতে বুনতে ওনার স্ত্রী উত্তর দিলেন, “উঁ?”
অধৈর্য্য হয়ে আবার বললেন, “ঐ পারুল।”
কাঁটাতে ঘর ফেলতে ফেলতে উত্তর এল, ” বলো গো?”
আদুরে গলায় গৌতমবাবু বললেন, “আমার একটা ইচ্ছে আছে।”
এবার পারমিতাদেবী নড়ে বসলেন। নরম গলায় বললেন, “কি গো?” ছোট্ট করে উত্তর পেলেন, “বিদেশ যাওয়ার।”
একগলা বিস্ময় নিয়ে পারমিতাদেবী বললেন, ” কি যে বলো! এই তো গতবছর তুস্কানি ঘুরে এলে রাতুলের কাছ থেকে।”
আবার ধৈর্য্য হারিয়ে গৌতমবাবু বললেন, “আমি তুস্কানির কথা বলছি না।” পারমিতাদেবী বললেন, “তাহলে? রাহুলের কাছে যাবে বলছ? এই শরীরে সার্ডিংহ্যাম যাওয়ার নামও আনবে না মুখে।”
স্ত্রীর গলায় রাগের পূর্বাভাস পেয়ে অশক্ত হাতে তার গাল ছুঁয়ে বললেন, “আমি আমাদের নিজেদের কথা বলছি গো। ছেলেরা তাদের মত থাক না। আমি তোমার হাতে হাত রেখে সোনার কার্পেটে হাঁটবো; চাঁদের আলোয়।”
হতভম্বের মতো দু মিনিট বসে থেকে পারমিতাদেবী মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠলেন, “মরণ, ঢং দেখো। নাতি নাতনি হয়ে গেছে আমাদের। এসব কি আমদের শোভা পায়? আমার কাজ আছে।”
“পারুল যেয়ো না। বস না আর একটু।” গমনদ্যত স্ত্রীর আঁচল ধরে আকুল গলায় বলে উঠলেন গৌতমবাবু।
নরম গলায় পারমিতাদেবী বলেন, “দাঁড়াও, তোমার ওষুধটা নিয়ে আসি।”
অবুঝ শিশুর মতো গৌতমবাবু বলে ওঠেন, ” সে আনবে’খন। আগে শোনো তো দেখি। বলতো দেখি কোন জায়গায় যাবো বলেছি? পারবে? জানি পারবে না। আমি তোমায় নিয়ে চীনে যাবো।”
“চীনে?” স্তম্ভিত পারমিতাদেবীর মুখে এরপর আর কথা যোগায় না।
“হে হে। কিচ্ছুটি জানো না। শানক্সিতে আছে একটা গাছ। মেইডেন হেয়ার ট্রি। কলেজ থেকে স্বপ্ন ছিল তোমাকে নিয়ে যাবো। তোমার ভালো লাগবে।” শিশুর মতো খিলখিলয়ে হেসে উঠলেন গৌতমবাবু।
স্বামীর বালখিল্যতায় পাল্লা দিতে না পেরে শ্লেষের গলায় বলে উঠলেন, “জানি তো। কলেজে মাও সে তুং তোমার বাবা ছিল।”
“আহা, শোনই না। গাছটা বড়ো অদ্ভুত। ১৪০০ বছর ধরে বেঁচে আছে। শরৎকালে পাতাগুলো সোনার হয়ে যায়। তোমাকে ঐ সোনাঝরা জায়গায় নিয়ে যাবো। লক্ষ্মীটি; রাগ কর না। এই একটি সাধ প্লিজ পূরণ করতে দাও।”

স্ত্রীঅন্ত প্রাণ মানুষটার প্রত্যেকটা শব্দে ঝরে পড়ছিল আকুতি। না, পারমিতাদেবীর কাছে না। নিয়তিদেবীর কাছে। তিনি জানতেন হাতে তাঁর আর বেশী সময় নেই। কেমো আর কাজ করছে না। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষ ঢুকে গেছে। তাও শেষ ইচ্ছে তাঁর পূরণ হয়নি.৩য় স্টেজ ক্যান্সারে ৫৭ বছর বয়সে থেমে গেছিল গৌতমবাবুর জীবনীশক্তি। আর তাঁর আদরের পারুল, যার পোষাকি নাম প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন কাজে। ৩৪ বছরের সঙ্গীর চলে যাওয়ার পর ৪ বছর কেটে গেছে। তুস্কানিতে বড়ো ছেলে রাতুল আর সার্ডিংহ্যামে ছোট ছেলে রাহুল নিজেদের বৃত্তে আবর্তন খায়। শুধু প্রথম সন্তান সঙ্ঘমিত্রা দেশের মাটির টান কাটাতে পারেনি। মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেও অধ্যাপিকা হয়েছে। ব্যাতিক্রম একটাই। সে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপিকা। আসলে, এ বাড়ির কেউই সায়েন্সের ধার ঘেঁষেনি। প্রজ্ঞাপারমিতা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। সৃষ্টিছাড়া সুন্দরী সে। গৌতমের সবচেয়ে আদরের ধন। অথচ মিত্রাকে নিয়ে চাপা অস্বস্তি একটা থেকে গেছে প্রজ্ঞাদেবীর মনে; সারাজীবন।

একদিন, মেয়ে দুম মাকে বলে বসল, “মা, বাবার শেষ ইচ্ছেটা কবে পূরণ করবে?”
একটা জার্নাল চেক করতে করতে ঘাড় তুলে প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “কোনটা?”
চশমাটা নাকের ডগায় তুলে মিত্রা বলল, “ওই সোনাঝরা গাছটার কাছে কবে যাবে?”
“পাগল হলি তুই মুনু?” প্রায় ‌ভৃত্সনার সুরে বলে উঠলেন প্রজ্ঞাদেবী, “আমি চলে গেলে স্টুডেন্টগুলোর কি হবে? বছরের মাঝে ছুটি নেওয়াটা অনৈতিক।”
“মা নিজের জন্য বেঁচেছ কোনোদিন?” মায়ের চোখে চোখ রেখে মিত্রা বলে উঠল, “সারাজীবন তো অন্যের জন্য মরলে।”
কথাটা ধ্বক করে প্রজ্ঞার বুকে লাগলো। একবারই তো বাঁচতে চেয়েছিলেন তিনি। নিজের মতো করে এবং গৌতম না থাকলে কেউ বাঁচাতে পারত তাকে সেই সময়।
“আজে বাজে কথা বোলো না মুনু।”, ধমকে উঠলেন প্রজ্ঞাদেবী।
কিন্তু মিত্রাকে তর্কে হারানো অতো সহজ না। এই গুণটা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া তার। মিত্রা বলে উঠল, “দেখো, কুরুশের কাঁটায় ক্লো‌ক বানানোতে তুমি সেরা। তাতে একটা তোমার একটা নাতি নাতনিকে শীতের জামা কিনতে হয় না। তোমার হাতের বানানো মুরগির রোস্ট পার্কস্ট্রিটকে হার মানায়। বাড়ির লোকের আবদার ফেলতে পার না তাই। মৈত্রম্যামের ক্লাস কেউ মিস করতে চায় না। কিন্তু এসবের মধ্যে প্রজ্ঞাপারমিতা কৈ? দ্যাখো, ভাইরা বিদেশে নিজের মতো বাঁচছে। আমি জয়কে নিয়ে সুখে আছি। আর তুমি? চুপচাপ জানলার ধারে বসে থাকো আর কাঁদো। অনেক হয়েছে আর না। আমি জয়কে বলে তোমার টিকেটের ব্যবস্থা করছি। তোমার এই চায়না ট্রিপটা দরকার।”
“মানে?”, প্রজ্ঞাদেবীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে।
“মানে দিন পনেরর ছুটি নিয়ে ঘুরে এস। আর এক বছর বাকি রিটায়ারমেন্টে তোমার। দাঁড়াও, জয়কে ফোন করি। ও হোটেল বুক করুক।”, মিত্রা ল্যান্ডলাইনে নম্বর ডায়াল করে বলে ওঠে, “হ্যালো, হ্যাঁ, আমি জয়ব্রত সেনের স্ত্রী বলছি।”
অসহায় চোখে দেখতে থাকেন নিজের মেয়ের কর্মতৎপরতা। মেয়ের এই ঝড়ের মতো কাজ করার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটা বার বার অস্বস্তিতে ফেলে তাঁকে। ও যেন বংশছাড়া।
অতঃপর প্রজ্ঞাপারমিতা দেবীর চিনযাত্রা শুরু হল। কোলকাতা থেকে উড়ান শুরু হল। গন্তব্য শানক্সি ; মেইডেন হেয়ার গাছ। তাং সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট তাইজংএর হাতে লাগান গাছ। গৌতমের স্বপ্নের জায়গা।

ক্রমশঃ (To be continued)