Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৬)

পরেরদিন একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠলেন ইন্টারকমের আওয়াজে। মেই ফোনে বলল, “আপনার শরীর ঠিক আছে? আপনি আজ রুমেই থাকুন। আমি ব্রেকফাস্ট টেবিল নিয়ে ওপরে আসছি।”
এলাহি আয়োজন ছিল ব্রেকফাস্টে। ছোট বাটিতে আদা দিয়ে ওয়ান্টন স্যুপ, মাংসের পিঠে, ছোট বাটিতে মেইফুন, একটা চৌকোণা অমলেট, কিছু সব্জি দিয়ে বানানো একটু ভাজা, ছোট বাটিতে ভাতের ওপর বাঁধাকপির আচার, তিলের নাড়ুর মতো দেখতে মিষ্টি।
প্রজ্ঞা দেবী বললেন, “একি! এত কে খাবে মেই?” মেই মিষ্টি হেসে বলল, “আপনি।” প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আমি তো আমিষ খাই না অনেকদিন।” পাকা গিন্নির মতো স্যুপে ফুঁ দিতে দিতে মেই বলল, “আজ খান। আপনার শরীরে জোর আসবে। মা এগুলো স্পেশালি আপনার জন্য বানাল।”
প্রজ্ঞাদেবী বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না যে তিনি বিধবা বলে আমিষ ছেড়ে দিয়েছেন। সংসারের চাপে লোকাচারের বিরোধিতা করা ঐ মেয়েটা মরে গেছে। তিনি সারাটা জীবন স্বামীর মঙ্গলকামনায় উপোষ করেছেন। অবশ্য মাঝখানে গৌতম টুক করে জল সাবু খাইয়ে দিত তাঁর হাজার বারণ সত্ত্বেও। ভক্তি করে ঠাকুরের কাছে মাথা নুইয়েছেন। মেয়ে আর ছেলেদুটোর জন্য পুজোপাঠ, জ্যোতিষের পাথর, বিয়ের আগে কুষ্ঠীবিচার কিচ্ছু বাদ রাখেননি। সারাজীবন মনে হয়েছে যদি তাঁর কৈশোর যৌবনে কেউ যদি একটা নীলার আংটি পরাত কি শ্বেতবেড়েলার মূল, তাহলে হয়ত জীবনে একটা বীভৎস দাগ থাকতো না। কিন্তু মেয়েটার মুখ চেয়ে মানা করলেন না। চুপচাপ খেয়ে নিলেন সবকটা।
মেই বলল, “একটা কথা ছিল ম্যাম, আজ কিন্তু ঝড় হতে পারে। খবরে বলেছে। সন্ধ্যের দিকে হবে। কাল আপনার ফ্লাইট ডিলে হতে পারে একটু। পারলে আজ দুপুরে মঠে চলে যান। আপনার পাশের রুমের লোকটা তো অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে ঘুরতে।” প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আচ্ছা। আজ বিকেলে শপিং ও করে নেব।”

বিকেলের পড়ন্ত বেলায় প্রজ্ঞাদেবী বাজার ঘুরে আরও কিছু গিফট নিলেন রুও আর মেইর জন্য। সারাদিন মন উচাটন হচ্ছে তাঁর। আকাশ গম্ভীর হতে শুরু করেছে। আর তাঁর মনে ঝড় চলছে কাল রাত থেকে। ৩২ বছর পর সিদ্ধার্থর সাথে দেখা হওয়াটা তাঁর এখনও হজম হচ্ছে না। কতো রাত তিনি কেঁদেছেন একটা সময়ে সিদ্ধার্থকে এক ঝলক দেখার জন্য। কত প্রার্থনা করেছেন যেন চোখ খুললে দেখেন, কোনও মন্ত্রবলে, সিদ্ধার্থ তাঁর পাশে দুষ্টুমি মাখা চোখে তাকিয়ে। কতোবার ব্যর্থ কল্পনা করেছেন ওর ঘুমন্ত মুখটা। তখন সেসব কিছুই পূর্ণ হয়নি। তাহলে আজ জীবনসায়াহ্নে কি করতে এলো সে? আইপডে গান বাজছে, “পুরনো সেইদিনের কথা।”

প্রজ্ঞা ক্লাসে বসে মন শক্ত করছে। সেদিনের পর দুদিন কেটে গেছে। কোনও লেকচার কানে ঢুকছে না। এক্সামের আর দুমাসও নেই। পাশ থেকে অসীমা ফিসফিস করে বলল, “গৌতমদার ওপর থেকে পুলিশ কেস তুলে নিয়েছে। বাড়িতে চলেও গেছে। তুই পারলে একবার দেখা করিস।”
জলে পড়ে থাকা মানুষ যেমন খড়কুটো ধরে বাঁচতে চায়, সেও সেই মুহূর্তে গৌতমকে হ্যাঙলার মতো অবলম্বন করতে চাইল। সন্ধ্যেবেলা সে যখন বাস থেকে নামলো, তলপেটর কাছে কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। মন শক্ত করতে চাইল প্রজ্ঞা একটুক্ষণের জন্য। গলার কাছটা শুকনো লাগছে তার। মনকে প্রবোধ দিল, ‘এত অপরাধবোধের কিছু নেই। গৌতম বন্ধু মাত্র। বন্ধুর কাছে সঙ্কোচের কিছু নেই।’ রাজা রাজবল্লভ স্ট্রীটের পাড়াটা চলছে নিজের তালে। বাড়ি থেকে কাঁসর ঘণ্টার আওয়াজ ভেসে আসছে। হাতে লেখা চিরকুট মিলিয়ে একটা বাড়িতে কড়া নাড়ল জোরে। উত্তেজনায় হাত কাঁপছে। একটি অল্পবয়সি স্কুলপড়ুয়া ছেলে দরজা ফাঁক করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে?” ছেলেটির চোখে সন্দেহ। পুলিশের চর নয়তো?
গলা খাঁকরে প্রজ্ঞা বলল, “নমস্কার। আমি প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র। গৌতমের জুনিয়র। দেখা করতে এসেছি একটু।”
কি ভেবে ছেলেটি বলল, “আসুন। বাইরের বৈঠকখানায় বসুন।”
কাঁপা কাঁপা পায়ে প্রজ্ঞা বৈঠকখানায় এসে বসল। সিদ্ধার্থর স্টাডির মতো বৈভব নেই; স্নিগ্ধতা আছে। ওকালতির বইও আছে সাহিত্যের পাশাপাশি। একটু পর ছেলেটি নেমে এসে বলল, “আসুন। দাদা ডাকছে ওপরে।” বড়ো একান্নবর্তী পরিবারের রাজপ্রাসাদের টানা বারান্দা পেরিয়ে যাচ্ছে সে। প্রাসাদই বটে বাড়িটা তার নিজের বাড়ির তুলনায়। দোতালার দক্ষিণের দিকের একটা ঘরে দেখল, গৌতম আধশোয়া হয়ে বসে আছে। প্রজ্ঞাকে দেখে মুখে ওর হাসি খেলে গেল। বলল, “ভাই, আমাদের একলা ছেড়ে দে একটু। দরজা টেনে দিস। অন্য কেউ যেন এখন আমাকে বিরক্ত না করে।”
ছেলেটি ঘাড় নেড়ে, দরজা টেনে চলে গেল।

প্রজ্ঞাকে বলল, “এসো। কাছে এসে বস। ও আমার জ্যেঠুর ছোটছেলে সৌরভ। আজকাল একটু কানে শুনতে সমস্যা হয়। ডাক্তার বলছে সেরে যাবে।” শুকনো মুখে প্রজ্ঞা এসে গৌতমের পালঙ্কে ওর পায়ের কাছে বসল। এই প্রথম ওর নাকে একটা অন্য রকম পুরুষালি গন্ধ এলো। দেখতে লাগলো গৌতমের শরীরটা। ব্যায়াম করা সুঠাম চেহারাতে মেদ জমেছে একটু। পাঞ্জাবির ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে একা রোমশ বুক। প্রশস্ত কাঁধের ওপর ব্যান্ডেজ জড়ানো। স্নিগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে গৌতম। নৈঃশব্দ্য ভেঙ্গে গৌতম বলল, “কি দেখছ পারুল অমন করে?”
প্রজ্ঞা চমকে তাকাল ওর দিকে। ওর স্বরে আগেও এমনি আদর মেশানো থাকতো?
সে বলল, “আমি বড্ড বোকা ছিলাম গো। তুমি জানতে সেদিন পুলিশ আমাদের মিছিলে লাঠিচার্জ করবে?”
গৌতম বলল, “হ্যাঁ। তোমার পড়া কেমন চলছে?”
শুকনো গলায় উত্তর এলো, “ভালো।”
তারপর একটা অসহ্য নীরবতা নেমে এলো গোটা ঘরে। শুধু দেওয়াল ঘড়িটা টিক টিক করে চলছে।

এমনি সময়ে প্রজ্ঞা বলে উঠল ব্যাকুল হয়ে,”আমি সিদ্ধার্থর সন্তানের মা হতে চলেছি। ওকে খবর দাও প্লিজ।”
গৌতমের মুখ দিয়ে বাক্যস্ফূর্তি হল না। অস্ফুটে বলল, “মানে?”
“সিদ্ধার্থ গত জানুয়ারির শেষের দিকে এসেছিল আমার কাছে। রাতে দেখা হয়েছিল। আমি তখনই……।”, কথা শেষ হওয়ার আগেই কাঁদতে কাঁদতে গৌতমের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল প্রজ্ঞা।
গৌতম চুপ করে বসে।
আর প্রজ্ঞা তার এতদিনের কান্না আজ উজাড় করে চলেছে।
দেওয়াল ঘড়ি একঘেয়ে সুরে টিকটিক করে চলছে। যেন মহাকালের প্রতিনিধি হয়ে ওদের সাক্ষী থাকছে। এমনি করে ঢং ঢং করে আটটা বেজে উঠল।
গৌতম বলল, “তুমি জানো সিদ্ধার্থ কোথায়?”
প্রজ্ঞা চোখ তুলে তাকাতেই বলল, “ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে ও ধরা পড়ে মালদায় গঙ্গা পেরতে গিয়ে। নক্সালের খাতায় নাম লিখিয়েছিল বহুদিন। আমরা জানতাম না। ওকে ওইদিন পুলিশে খুব মারে। তারপর কলকাতায় চালান করা হয় ওকে। ওর বাবা আইন ঘেঁটে, মুখ্যমন্ত্রীকে ধরে, ওকে রাজসাক্ষী করে বিদেশে পাঠায় গত মাসে। খুব সম্ভবত ও এখন প্যারিসে। ওকে ওখান থেকে অগাস্টে বার্লিনে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যতদিন না রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় ও ফিরবে না।”
প্রজ্ঞা স্তম্ভিত হয়ে সব কথা শুনে যাচ্ছিল। গৌতমের কথা গুলো যেন কান কেটে ওর মস্তিস্কে ঢুকছিল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল, “কি বললে?”
গৌতম বলল, “আগামী পাঁচবছরের আগে ও ফিরবে না। পিএইচডি শেষ করে ফিরবে।”
হঠাৎ প্রজ্ঞার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। এই স্বার্থপরের জন্য ও নিজের সম্ভ্রম খুইয়েছে? এই লোকটাতে সে ভালবেসেছে? এর জন্য নিজের পড়াশুনো বিসর্জন দিতে বসেছিল? ঘোর লাগা গলায় বলল, “আমি ডাক্তারের কাছে যাবো এখনই। আমি এই সন্তানকে চাই না। হয় এ শেষ হবে নয়তো আমি।”
প্রেতিনীর মতো উন্মত্ত হয়ে প্রজ্ঞা দরজার দৌড়ে যেতেই গৌতম ওকে পেছন থেকে আটকায়। জাপটে ধরে নিজের মধ্যে। প্রজ্ঞার মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে, “পারুল আজ বাড়ি যাও লক্ষ্মীটি। ঠাণ্ডা হও। আর একটি মাস সময় দাও আমাকে। তোমার অসম্মান হতে দেব না। তুমি শুধু পরীক্ষাটা দিয়ে দাও মন দিয়ে। ”

সে রাতে সৌরভ ট্যাক্সি করে প্রজ্ঞাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। এক মাস পর গৌতম ওর বাড়িতে নিজে এসে বিবাহ প্রস্তাব দেয়। তখন ওর রোজগার বলতে দুটো টিউশনি। দাদাদের অমতে, গৌতমের বাড়ির বিরোধিতার মাঝেও গৌতম তাকে বিয়ে করে। বিয়ের কয়েক মাস পরই ফলপ্রকাশ হয়। প্রজ্ঞা ক্লাসে প্রথম হয়। তাকে গৌতম ভর্তি করে মাস্টার্সে । আর তার মাস ছয়েক পর সে জন্ম দেয় এক ডাকসাইটে সুন্দরী শিশুকন্যার। প্রজ্ঞার মতো পটলচেরা চোখ আর সিদ্ধার্থর মতো টিকালো নাক।
মেয়েকে কোলে নিয়ে ক্লান্ত স্বরে সে বলে, “সঙ্ঘমিত্রা।”
গৌতম শুধোয়, “ও কি তাই চেয়েছিল?”
ঘুম জড়ানো স্বরে সে বলে, “হ্যাঁ।”
মেয়েকে কোলে গৌতম উচ্ছ্বাসে বলে ওঠে, “সঙ্ঘমিত্রা বসু। আমাদের প্রথম সন্তন। এই বাড়িতে প্রথমসন্তান মেয়ে কোনোদিন হয়নি। এ আমাদের লক্ষ্মী।”

সত্যই সে লক্ষ্মী। তার জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গৌতম পাশেই একটা স্কুলে চাকরি পায় ভূগোলের শিক্ষকের। শুধু সৌন্দর্য আর ভাগ্যের জোরে তার জন্মের অবৈধতার কথা চাপা পড়ে যায় ক্রমশ। সে তার বাকি দুই ভাইয়ের থেকে অনেক মেধাবী, অনেক যোগ্য। সে তার বাবার গর্বের বস্তু। গৌতমের মাত্রাছাড়া প্রশ্রয়ে বড্ড স্বাধীনচেতা হয়েছে সে।
অথচ তাকে নিয়ে প্রজ্ঞার অস্বস্তি কোনোদিন যায়নি। কিসের এত অহঙ্কার ছিল গৌতমের, নিজের স্ত্রীর অবৈধ সন্তান নিয়ে? কি প্রমাণ করতে চাইত? সে মহান? নাকি বন্ধুর প্রতি কর্তব্য? অস্বস্তি আজও পিছু ছাড়েনি তাঁর। জানলা দিয়ে দেখলেন আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। হাল্কা করে ঠাণ্ডা হাওয়া দিতে শুরু হয়েছে।

আগামী পর্বে সমাপ্য (Next part will be the last part)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৪)

১৯৭২ সাল; প্রজ্ঞা সেকেন্ড ইয়ারে, গৌতমের ফাইনাল ইয়ার। সিদ্ধার্থ পাশ করে বেরিয়ে গেছে। ক্রমশ সিদ্ধার্থ অনুপস্থিত হতে থাকে ইউনিয়ন মিটিঙে, চিত্রা সিনেমার শোতে, ভিক্টোরিয়ার লেকে, কফি হাউসে। কমরেড গৌতম বসু তখন সামলায় কলেজ ইউনিয়ন ওর অনুপস্থিতিতে। আর হয়ে ওঠে প্রজ্ঞার বন্ধু, আশ্রয়দাতা। প্রজ্ঞার রাজনীতি করা নিয়ে বাড়িতে অশান্তি হয় প্রায়ই। বাবা মা চায় না গেরস্ত বাড়ির সোমত্ত মেয়ে এভাবে ছুটে বেড়াক। রক্ষে একটাই, প্রবল কংগ্রেসি বাড়ির গৃহকর্তা জানেন না যে কন্যাটি বিপক্ষ দলের সমর্থক। তাও হয়তো মেজ আর সেজ দাদার প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছিল বলে প্রজ্ঞা বাড়তে থাকে। বাড়ির লোক মুখ বুজে মেনে নেয়। কেই বা চায় রোজগেরে ছেলেদের চটাতে! বাংলায় অরাজকতা বাড়তে থাকে। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের দিকে হাওয়া ঘুরছে ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে কার্ফু ঘোষণা হয়ে যায়। প্রধান বিরোধী নেতা হিসেবে জ্যোতি বসু ভীষণ জনপ্রিয় যুবসমাজে। শহরতলির দিকে নক্সালদের আতঙ্ক প্রবল। এই সময়ে শ্লোগান উঠল, ‘পুলিশ তুমি যতই মারো। মাইনে তোমার একশো বারো।’ কলেজে খবর আসতে থাকে রোজ কেউ না কেউ গ্রেফতার হচ্ছে। ধীরে ধীরে সুবীর, সুনিপ, প্রমীলা, গীতা, অতিন, শম্পা; মেধাবী ছেলেমেয়ে গুলো নক্সাল হয়ে যায়। তারপর একদিন গ্রেফতার হয়ে যায় মাঝরাতে। তারপর? তারপর গড়ের মাঠে দৌড়াতে দৌড়াতে ওরা পৃথিবী থেকে মুছে যায়।

তাও এই ঝড়ের মাঝে সিদ্ধার্থ আর প্রজ্ঞা নিভৃত খুঁজে নেয় সিদ্ধার্থর স্টাডি রুমে। বৃষ্টির দিনে দুটো শরীর উষ্ণতা খুঁজে নেয় একে অপরের সান্নিধ্যে। চুমুতে চুমুতে হারিয়ে যায় ওরা। এমনি একদিন মাতাল করা দিনে দুজনে এলোমেলো বিছানায় শুয়ে ছিল। প্রজ্ঞার নগ্ন পিঠে সিদ্ধার্থ আঙ্গুল বোলাচ্ছিল।
প্রজ্ঞা জিজ্ঞেস করল, “কি আঁকছ অমনি করে আঙ্গুল বুলিয়ে?”
চোখের কোণে হাসি ফুটিয়ে সিদ্ধার্থ বলল, “তোমাকে।”
ক্ষণিক নিস্তব্ধ থাকার পর প্রজ্ঞা আবার বলে উঠল, “সিদ্ধার্থ।”
অস্ফুটে সিদ্ধার্থ বলল, “উঁ?”
“তুমি আমায় ভালবাস?”, প্রজ্ঞার গলায় সঙ্কোচ।
“নাঃ। একদমই না।”, সিদ্ধার্থ দুষ্টুমি করে প্রজ্ঞার নাক টিপে দেয়।
“আঃ, সিরিয়াসলি বলো না।”, প্রজ্ঞার গলায় চাপা বিরক্তি।
মুহূর্তে প্রজ্ঞার পাখির মতো হাল্কা শরীরটা নিজের ওপর তুলে নিয়ে সিদ্ধার্থ বলে, “বাসি। ভীষণ।”
“তাহলে তুমি কোথায় উধাও হয়ে যাও আমাকে না বলে?”, প্রজ্ঞার গলায় অনুযোগের সুর।
প্রজ্ঞার ছুল গুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিয়ে সিদ্ধার্থ বলে, “যাই, এক জায়গায়। বলা যাবে না। মন্ত্রগুপ্তি।”
“সিদ্ধার্থ!”। ডুকরে ওঠে প্রজ্ঞা।
“এই বোকা একদম কাঁদে না। না।” সিদ্ধার্থ কামড়ে ধরে প্রজ্ঞার তোলার ঠোঁট, “মিতা। তুমি শুধুই আমার। তোমাকে ছেড়ে আমি কোথায় যাবো?”
“হুহঃ তোমার জীবনে আবার মেয়ের অভাব?!”, সদ্য কৈশোর পেরোনো প্রজ্ঞার গলায় অভিমান টের পায় সিদ্ধার্থ। প্রেয়সীর মনে প্রলেপ দিতে বলে ওঠে, ” তা বলতে পার। তবে তারা কেউ আমাকে ডিবেটে হারায়নি। আমার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উদ্বাস্তু কলোনির কাজে সাহায্য করেনি।”
প্রজ্ঞা আঁকড়ে ধরে প্রেমিকে, “আমার বড়ো ভয় করে গো।”
“কিসের?”, স্নেহাচ্ছন্ন গলায় বলে সিদ্ধার্থ।
ভীরু হরিণীর মতো চোখে প্রজ্ঞা বলে, “আমাদের ভালোবাসা ফসিল হয়ে যাবে।”
“ধুর পাগল।”, অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে সিদ্ধার্থ, “একবার এই বুর্জোয়া সরকারটা উলটে যাক। আমাদের সন্তানকে নতুন পৃথিবী দেখাব আমি।”
“সত্যি?”, প্রজ্ঞার চোখে খুশি উপচে পড়ে।
“হ্যাঁ গো। আমি ঠিক করেছি, ছেলে হলে নাম দেব দেবাদৃত আর মেয়ে হলে নাম দেব সঙ্ঘমিত্রা। এবার তোমার কাকে চাই?, সেই দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকায় সে প্রজ্ঞার দিকে।
“ধ্যাত! অসভ্য।” এই বলে সিদ্ধার্থর ঠোঁটদুটো চেপে ধরে সে। আবেগে ভেসে যায় দুজন।

ঘড়িতে প্রায় সাড়ে ৯টা বাজে। মেইর দেরি হওয়াতে বিরক্ত হচ্ছেন প্রজ্ঞাদেবী। ডিনারটাইম পার করে খাওয়াটা তার পছন্দ কোনোকালে না। মঠটাও আস্তে আস্তে খালি হচ্ছে। আইপডটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ান।হঠাৎ কানে আসে তাঁর, “মিতা তুমি?”
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই ভূত দেখার মত চমকে ওঠেন তিনি। ভুতই তো! নিজের হাতে কবর দেওয়া পুরনো জীবন যদি আবার বর্তমানে হানা দেয়, তো সেটা ভূত না? স্পষ্ট দেখলেন, মেইডেন হেয়ার গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সিদ্ধার্থ। সেই সুপুরুষ চেহারা। বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে ঠিকই। মধ্যপ্রদেশ ঈষৎ স্ফীত। চুল আর দাড়িতে পাক ধরেছে। কিন্তু চোখদুটো আগের মতই ঝকঝকে। হাতে একটা ক্যামেরা ধরা তাঁর।
“সিদ্ধার্থ!”, অস্ফুটে মুখ দিয়ে বেরল তাঁর। ৩২ বছর পর আবার মুখোমুখি দুজনে।
অবাক চোখে সিদ্ধার্থবাবু দেখতে থাকেন তাঁর একদা প্রেয়সীকে। সোনাঝরা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সাদা তাঁতের শাড়ি পড়ে। গায়ে একটা শাল জড়ানো। সিঁথির দুদিকের চুলে পাক ধরেছে। চামড়া কুঁচকে গেছে কিছুটা। শুধু শুন্য সিঁথিটা বুকে ধাক্কা মারল ঠিকই আবার কৌতূহলও জাগাল অনেক।
কয়েকমুহূর্ত যেন সময় থমকে ছিল। তারপর প্রজ্ঞাদেবীর ভেতর থেকে যেন একটা বিস্ফোরণ বেরিয়ে আস্তে চাইল। বেরিয়ে আস্তে ছাইল অনেকদিনের জমানো রাগ, দুঃখ, হতাশা।উহ! কি স্পর্ধা লোকটার! সাহস হল কি করে ‘মিতা’ বলে ডাকতে? কিন্তু তিনি উত্তর দেওয়ার আগেই মেই চলে এল।
“মাফ করবেন ম্যাম। একটু দেরি হয়ে গেল। চলুন এখন, কাল আবার আসব।”, মেই এসে ওনার হাত ধরে নিয়ে চলে গেল ওদের বাড়ি।

ক্রমশঃ (To be continued)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৩)

আজ বেশ শীত করছে। গু গুইয়িনের বৌদ্ধ মঠটা অপূর্ব সুন্দর। সকালে মেই পৌঁছে দিয়ে গেছে। আবার সেই ডিনারের আগে আনতে আসবে। ওর বাড়ি থেকে ১ ঘণ্টা মতো লাগে। প্রজ্ঞাদেবী গায়ে কাশ্মীরি শালটা টেনে বসলেন মেইডেন হেয়ারের নিচে। শরতের বিদায়বেলা। তাই টুপ টুপ করে পাতাগুলো খসে যাচ্ছে পাতাগুলো। একটা নিশ্বাস ফেলে প্রজ্ঞাদেবী হেলান দিলেন। কানে রাতুলের দেওয়া আইপডে গান বাজছে; হেমন্ত মুখার্জীর গলায়, ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙ্গল ঝড়ে’। আবেশে চোখ বুঝলেন তিনি।

ঝড়? হ্যাঁ, ঝড়ই ছিল সময়টা। আর সেই ঝড়েই হারিয়ে যেতে বসেছিল মিতা। তখন প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র ঐ নামেই বেশি পরিচিত ছিল। টালিগঞ্জের এক ভদ্রস্থ গৃহস্থ মধ্যবিত্তের বাড়ির মেয়ে মিতা প্রেসিডেন্সিতে আসে ইতিহাস নিয়ে পড়তে। চার দাদার পরের একমাত্র বোন মিতা। দুদিকে কলাবেনি ঝুলিয়ে একটা সাদামাটা তাঁতের শাড়ি পরে কলেজ যেত। ওর ঐ মিষ্টি মুখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমাটা বড্ড বেমানান ছিল। হাতে থাকতো দুগাছি সরু সোনার চুড়ি। তার এই বিদ্যেচর্চা পাড়ার অনেকের দ্বিপ্রাহরিক গল্পচর্চার কেন্দ্র ছিল।
সময়টা ১৯৭১ সাল।
সময়টা বড্ড অস্থির ছিল।
নক্সালবাড়ি আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে প্রায়। পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দলনেতা হিসেবে জ্যোতি বসুর উত্থান হচ্ছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ইন্দিরা গান্ধীর কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকৃতি দিয়েছে। থেকে থেকে কলকাতায় ব্ল্যাকআউট হচ্ছে। আকাশে যুদ্ধবিমান উড়ে যাচ্ছে ঘন ঘন। কোলকাতাবাসীরা ভয়ে কাঁপত, ‘এই বুঝি বোম পড়ল’।

এই ঝোড়ো সময়ে মিতার প্রবেশ হল প্রেসিডেন্সীতে। আর সেখানে তার জীবনে প্রবেশ হল সিদ্ধার্থ সেনের। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে ফাইনাল ইয়ার সিনিয়র। ৫’১০’ উচ্চতা, গৌরবর্ণ, অসাধারণ সুপুরুষ ছেলেটি যখন সেতার হাতে উদাত্ত কণ্ঠে ভৈরবী রাগ ধরত, চারপাশ স্তব্ধ হয়ে যেত। কলেজের ডিবেট চ্যাম্পিয়ন ছিল সে। কানাঘুষোতে শোনা যেত, মানু রায়ের সাথে মাঝে মাঝেই চিয়ার্স বলে ওঠেন ওর বাবা। ছেলের নামও নাকি বন্ধুর সাথে মিলিয়ে রাখা। তবে,কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার সুধাংশু সেনের ছেলের পরিচয়ের খোলস কবেই ঝেড়ে ফেলেছিল সে। তা, এহেন অসাধারণ একটি ছেলে, অতিসাধারণ মিতার কাছে কি করে ডিবেটে হেরে যায়, সেটা রহস্য; হয়তো মহাকালের রহস্য। সেবার ১৯৭১ সালে প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র, তর্কযুদ্ধে সিদ্ধার্থ রায়কে হারিয়ে, একটা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। আর সেটাই ছিল ঝড়ের সূত্রপাত। সিদ্ধার্থ মুগ্ধ হয়েছিল মিতার বাগ্মিতায়। ওর শিরায় শিরায় মিতা জড়িয়ে পড়ে। অভিনন্দন দিয়ে যে বন্ধুত্বের সূচনা করেছিল, একদিন এক বিকেলের পড়ন্ত বেলায় মিতার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে তার পরিণতি দেয় সিদ্ধার্থ। ধীরে ধীরে সিদ্ধার্থ মিতার অন্তর্মুখীতার খোলস ভাঙ্গে। প্রত্যক্ষ ছাত্ররাজনীতিতে মিতা জড়িয়ে পড়ে ওর সাথে। ইতিহাসের ক্লাস ফিকে পড়ে যায় রাজনীতির সামনে। ক্রমশ, ও মিতা থেকে, কমরেড প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র হয়ে ওঠে। এক অসাধারণ বাগ্মী, মেধাবী মেয়ে।

মিতা প্রায়ই জিজ্ঞেস করত, “আচ্ছা তোমার বাবা জানতে পারলে কি হবে?”
গাড় আলিঙ্গনে ওকে ধরে কৌতুক চোখে সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করত, “কোনটা?”
“এই যে তুমি মার্ক্সকে পূজ্যপাদ ভাব?”
“ফুঃ, কি হবে? বাড়ি থেকে বের করে দেবে। সেতো মুক্তি আমার। তুমি আমি দুজনে মিলে তখন জ্যোতিবাবুর জন্য মিছিল বার করব।”
“ধ্যাত, পাগল!” এই বলে মিতা সিদ্ধার্থর বুকে কিল মারত।

ঝড় বারতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। যোধপুর পার্কের রেডিওস্টেশন থেকে শিল্পীদের গানের সম্প্রচার চলে। দক্ষিণ কলকাতা তখন অভিজাতদের প্রাণকেন্দ্র। আস্তে আস্তে অনুপ্রবেশকারীরা দখল করতে থাকে কোলকাতার ফুটপাথ। উলঙ্গ, কঙ্কালসার মানুষগুলো, প্রাণের দায়ে পালিয়ে আসা অসহায় প্রাণগুলো, একমুঠো ফ্যানভাতের জন্য গলা চিরে ফেলে। বাংলাতে মুখ্যমন্ত্রীর আসন খালি। রাষ্ট্রপতি শাসনের মাঝে কফিহউস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কানু স্যান্যাল নিয়ে। কফির পেয়ালাতে ঝড় তোলে বিটলসের গান, বম্বের ফিল্ম, উত্তম-সুচিত্রার রসায়ন। শুধু সময় থেমে যেত যখন মিতা গাড়ির ভেতর সিদ্ধার্থর বুকে মাথা দিয়ে চুপ করে ওর হৃৎস্পন্দন শুনত। আর তারপর চুম্বনের আবেশে ওরা ভুলে যেত আরেকটা প্রকাণ্ড ঝড় আসছে, ওলট পালট করা ঝড়।

“আচ্ছা, আপনি কি প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র?” নার্ভাস গলায় একটা প্রশ্নে মিতা পেছনে ঘরে। এই একটু আগে ইউনিয়ন মিটিং শেষ হয়েছে। পরের দিন রিফিউজি কলোনিতে খাবার বিলি করতে যাবে ওরা। তারই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি করছিল মিতা। মাথায় অনেক কাজের চাপ। এর মাঝে নিতান্ত সাধারণ, ধুতি পাঞ্জাবি পরা চশমাপরা একটি ছেলের বেমক্কা ডাকে বিরক্ত হল মিতা।
“নমস্কার। আমি প্রজ্ঞাপারমিতা।”
“নমস্কার। আমি গৌতম বসু। আমি জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্টে পড়ি। সেকেন্ড ইয়ার। আমি সিদ্ধার্থের বন্ধু।”
একটু বিস্ময় নিয়ে মিতা বলে ওঠে, “ও। বলুন? ও ঠিক আছে তো?”
আলতো হেসে ছেলেটি বলে ওঠে, “না। না। ভয়ের কিছু নেই। আসলে একটা বিশেষ দরকারে ও বর্ধমান গেছে। কাল কলোনির কাজে ও উপস্থিত থাকতে পারবে না।”
“সিদ্ধার্থ আসবে না মানে? কৈ? আমায় তো কিছু বলেনি।”, মিতার গলায় একসাথে বিরক্তি আর অসহায়তা ফুটে ওঠে।
তড়িঘড়ি করে গৌতম বলে ওঠে, “আসলে কাল রাতে ওর দিদার মৃত্যু হয়েছে। ও তাই গেছে বর্ধমানে। শ্রাদ্ধ শেষে ফিরে আসবে।”
মিতার হঠাৎ রাগ হয়ে গেল। তলার ঠোঁটটা দাঁতে চেপে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না সে তাও। গলার কাছে একটা কষ্ট দলা পাকাচ্ছিল।
ওর চোখ দেখে গৌতম বলল, “দেখুন, প্রজ্ঞা, আপনাকে আজ বাড়ি অব্দি এগিয়ে দিয়ি। আজ সন্ধ্যে হয়ে এল প্রায়।”
দৃঢ় গলায় মিতা বলে উঠল, “ধন্যবাদ। আমি নিজে চলে যাবো।”

ঝিরি ঝিরি করে পাতা গুলো খসে পড়ছে প্রজ্ঞাদেবীর কোলের ওপর। শরতের ঠাণ্ডা হাওয়া থেকে বাঁচতে শালটা আরও টেনে বসলেন। এখনও হাসি পায় স্বর্গত স্বামীর সাথে প্রথম আলাপটা মনে পড়লে। যদি গৌতম বেঁচে থাকতো, তাহলে তাকে জড়িয়ে ধরে বলত, “পারুল, কাছে এস আরও। ঠাণ্ডা লেগে যাবে।” এমনি সময়ে একটা পাতা ওনার কোলে পড়ল। সত্যি যেন সোনার পাতা। প্রজ্ঞাদেবী একটু চঞ্চল হয়ে উঠলেন। রাত বাড়ছে। মেই তো এখনও এল না ওনাকে আনতে। বলেছিল আজ জিন্সেং স্যুপ করে দেবে।
গানের ট্র্যাক বদলে যায় ক্রমশ। এবার হেমন্তর গলায় বাজছে, “দুরন্ত ঘূর্ণি।”

ক্রমশঃ (To be Continued)