Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৪)

১৯৭২ সাল; প্রজ্ঞা সেকেন্ড ইয়ারে, গৌতমের ফাইনাল ইয়ার। সিদ্ধার্থ পাশ করে বেরিয়ে গেছে। ক্রমশ সিদ্ধার্থ অনুপস্থিত হতে থাকে ইউনিয়ন মিটিঙে, চিত্রা সিনেমার শোতে, ভিক্টোরিয়ার লেকে, কফি হাউসে। কমরেড গৌতম বসু তখন সামলায় কলেজ ইউনিয়ন ওর অনুপস্থিতিতে। আর হয়ে ওঠে প্রজ্ঞার বন্ধু, আশ্রয়দাতা। প্রজ্ঞার রাজনীতি করা নিয়ে বাড়িতে অশান্তি হয় প্রায়ই। বাবা মা চায় না গেরস্ত বাড়ির সোমত্ত মেয়ে এভাবে ছুটে বেড়াক। রক্ষে একটাই, প্রবল কংগ্রেসি বাড়ির গৃহকর্তা জানেন না যে কন্যাটি বিপক্ষ দলের সমর্থক। তাও হয়তো মেজ আর সেজ দাদার প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছিল বলে প্রজ্ঞা বাড়তে থাকে। বাড়ির লোক মুখ বুজে মেনে নেয়। কেই বা চায় রোজগেরে ছেলেদের চটাতে! বাংলায় অরাজকতা বাড়তে থাকে। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের দিকে হাওয়া ঘুরছে ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে কার্ফু ঘোষণা হয়ে যায়। প্রধান বিরোধী নেতা হিসেবে জ্যোতি বসু ভীষণ জনপ্রিয় যুবসমাজে। শহরতলির দিকে নক্সালদের আতঙ্ক প্রবল। এই সময়ে শ্লোগান উঠল, ‘পুলিশ তুমি যতই মারো। মাইনে তোমার একশো বারো।’ কলেজে খবর আসতে থাকে রোজ কেউ না কেউ গ্রেফতার হচ্ছে। ধীরে ধীরে সুবীর, সুনিপ, প্রমীলা, গীতা, অতিন, শম্পা; মেধাবী ছেলেমেয়ে গুলো নক্সাল হয়ে যায়। তারপর একদিন গ্রেফতার হয়ে যায় মাঝরাতে। তারপর? তারপর গড়ের মাঠে দৌড়াতে দৌড়াতে ওরা পৃথিবী থেকে মুছে যায়।

তাও এই ঝড়ের মাঝে সিদ্ধার্থ আর প্রজ্ঞা নিভৃত খুঁজে নেয় সিদ্ধার্থর স্টাডি রুমে। বৃষ্টির দিনে দুটো শরীর উষ্ণতা খুঁজে নেয় একে অপরের সান্নিধ্যে। চুমুতে চুমুতে হারিয়ে যায় ওরা। এমনি একদিন মাতাল করা দিনে দুজনে এলোমেলো বিছানায় শুয়ে ছিল। প্রজ্ঞার নগ্ন পিঠে সিদ্ধার্থ আঙ্গুল বোলাচ্ছিল।
প্রজ্ঞা জিজ্ঞেস করল, “কি আঁকছ অমনি করে আঙ্গুল বুলিয়ে?”
চোখের কোণে হাসি ফুটিয়ে সিদ্ধার্থ বলল, “তোমাকে।”
ক্ষণিক নিস্তব্ধ থাকার পর প্রজ্ঞা আবার বলে উঠল, “সিদ্ধার্থ।”
অস্ফুটে সিদ্ধার্থ বলল, “উঁ?”
“তুমি আমায় ভালবাস?”, প্রজ্ঞার গলায় সঙ্কোচ।
“নাঃ। একদমই না।”, সিদ্ধার্থ দুষ্টুমি করে প্রজ্ঞার নাক টিপে দেয়।
“আঃ, সিরিয়াসলি বলো না।”, প্রজ্ঞার গলায় চাপা বিরক্তি।
মুহূর্তে প্রজ্ঞার পাখির মতো হাল্কা শরীরটা নিজের ওপর তুলে নিয়ে সিদ্ধার্থ বলে, “বাসি। ভীষণ।”
“তাহলে তুমি কোথায় উধাও হয়ে যাও আমাকে না বলে?”, প্রজ্ঞার গলায় অনুযোগের সুর।
প্রজ্ঞার ছুল গুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিয়ে সিদ্ধার্থ বলে, “যাই, এক জায়গায়। বলা যাবে না। মন্ত্রগুপ্তি।”
“সিদ্ধার্থ!”। ডুকরে ওঠে প্রজ্ঞা।
“এই বোকা একদম কাঁদে না। না।” সিদ্ধার্থ কামড়ে ধরে প্রজ্ঞার তোলার ঠোঁট, “মিতা। তুমি শুধুই আমার। তোমাকে ছেড়ে আমি কোথায় যাবো?”
“হুহঃ তোমার জীবনে আবার মেয়ের অভাব?!”, সদ্য কৈশোর পেরোনো প্রজ্ঞার গলায় অভিমান টের পায় সিদ্ধার্থ। প্রেয়সীর মনে প্রলেপ দিতে বলে ওঠে, ” তা বলতে পার। তবে তারা কেউ আমাকে ডিবেটে হারায়নি। আমার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উদ্বাস্তু কলোনির কাজে সাহায্য করেনি।”
প্রজ্ঞা আঁকড়ে ধরে প্রেমিকে, “আমার বড়ো ভয় করে গো।”
“কিসের?”, স্নেহাচ্ছন্ন গলায় বলে সিদ্ধার্থ।
ভীরু হরিণীর মতো চোখে প্রজ্ঞা বলে, “আমাদের ভালোবাসা ফসিল হয়ে যাবে।”
“ধুর পাগল।”, অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে সিদ্ধার্থ, “একবার এই বুর্জোয়া সরকারটা উলটে যাক। আমাদের সন্তানকে নতুন পৃথিবী দেখাব আমি।”
“সত্যি?”, প্রজ্ঞার চোখে খুশি উপচে পড়ে।
“হ্যাঁ গো। আমি ঠিক করেছি, ছেলে হলে নাম দেব দেবাদৃত আর মেয়ে হলে নাম দেব সঙ্ঘমিত্রা। এবার তোমার কাকে চাই?, সেই দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকায় সে প্রজ্ঞার দিকে।
“ধ্যাত! অসভ্য।” এই বলে সিদ্ধার্থর ঠোঁটদুটো চেপে ধরে সে। আবেগে ভেসে যায় দুজন।

ঘড়িতে প্রায় সাড়ে ৯টা বাজে। মেইর দেরি হওয়াতে বিরক্ত হচ্ছেন প্রজ্ঞাদেবী। ডিনারটাইম পার করে খাওয়াটা তার পছন্দ কোনোকালে না। মঠটাও আস্তে আস্তে খালি হচ্ছে। আইপডটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ান।হঠাৎ কানে আসে তাঁর, “মিতা তুমি?”
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই ভূত দেখার মত চমকে ওঠেন তিনি। ভুতই তো! নিজের হাতে কবর দেওয়া পুরনো জীবন যদি আবার বর্তমানে হানা দেয়, তো সেটা ভূত না? স্পষ্ট দেখলেন, মেইডেন হেয়ার গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সিদ্ধার্থ। সেই সুপুরুষ চেহারা। বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে ঠিকই। মধ্যপ্রদেশ ঈষৎ স্ফীত। চুল আর দাড়িতে পাক ধরেছে। কিন্তু চোখদুটো আগের মতই ঝকঝকে। হাতে একটা ক্যামেরা ধরা তাঁর।
“সিদ্ধার্থ!”, অস্ফুটে মুখ দিয়ে বেরল তাঁর। ৩২ বছর পর আবার মুখোমুখি দুজনে।
অবাক চোখে সিদ্ধার্থবাবু দেখতে থাকেন তাঁর একদা প্রেয়সীকে। সোনাঝরা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সাদা তাঁতের শাড়ি পড়ে। গায়ে একটা শাল জড়ানো। সিঁথির দুদিকের চুলে পাক ধরেছে। চামড়া কুঁচকে গেছে কিছুটা। শুধু শুন্য সিঁথিটা বুকে ধাক্কা মারল ঠিকই আবার কৌতূহলও জাগাল অনেক।
কয়েকমুহূর্ত যেন সময় থমকে ছিল। তারপর প্রজ্ঞাদেবীর ভেতর থেকে যেন একটা বিস্ফোরণ বেরিয়ে আস্তে চাইল। বেরিয়ে আস্তে ছাইল অনেকদিনের জমানো রাগ, দুঃখ, হতাশা।উহ! কি স্পর্ধা লোকটার! সাহস হল কি করে ‘মিতা’ বলে ডাকতে? কিন্তু তিনি উত্তর দেওয়ার আগেই মেই চলে এল।
“মাফ করবেন ম্যাম। একটু দেরি হয়ে গেল। চলুন এখন, কাল আবার আসব।”, মেই এসে ওনার হাত ধরে নিয়ে চলে গেল ওদের বাড়ি।

ক্রমশঃ (To be continued)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ২)

সঙ্ঘমিত্রা তার মায়ের বেরানোর প্ল্যানটা ভালোই বানিয়েছিল। তবে অক্টোবরে কোলকাতার দুর্গাপুজো ছেড়ে কে যেতে চায়? তায় সময়টা ২০১০ সাল। তখনতো স্মার্টফোন সবে ঢুকেছে বাঙ্গালীর ঘরে। বিএসএনএল, এয়ারটেল ছাড়া তেমন কোনও ভালো সার্ভিস প্রোভাইডার নেই। ৪ জি ইন্টারনেট দূরঅস্ত ব্যাপার। জয় এসে প্ল্যান বোঝাল, “দেখুন মা, বেইজিংএ থাকবেন ৭ দিন। ওখানে আমার পুরনো বন্ধু থাকবে। ওর নাম দীপ্ত। ও আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দেবে আর ওইই গাইড এনে দেবে আর আপনার সাথে থাকবে।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “বাবা, ফরবিডেন সিটি ঘুরতেই তো ২ দিন লেগে যাবে।”
জয় বলল, “লাগুক না। তার পরের দিন, টেম্পল অফ হেভেন, জিংশান পার্ক, প্যালেস মিউসিয়াম ঘুরে নেবেন। আর বার্ডস নেস্ট স্টেডিয়ামটা মিস করবেন না”
তড়বড় করে মিত্রা বলে উঠল, “অতো ডিরেকশন দিতে হবে না মাকে। তুমি দীপ্তকে বলে দিও মা ওর কাছেই খেয়ে নেবে।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “ও মা! আমি তো চাইনীজ খাই রে মুনু।”
মিত্রা বলল, “আমরা বঙ্গ-চৈনিক ভার্সান খাই মা। ওথেন্টিক চীনে খাবার নাও খেতে পার তুমি।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “মুনু, আমি একলা যাবো না, ভয় করছে।”
মিত্রা বলল, “ভয় কাটাও মা। তুমি যাচ্ছ, আর হ্যাঁ পারলে আমার জন্য একটা ভালো হেয়ার পিন এনো তো।”
জয় বলল, “দীপ্তর বাড়ি থেকে আপনি কল করে নেবেন আমাদের। ওদের টাইম আড়াই ঘণ্টা এগিয়ে। আপনি ওদের লোকাল টাইম রাত সাড়ে ১০ টাতে ফোন করে নেবেন। চিন্তা করবেন না মা।”

একমাস ধরে এইসব প্ল্যানিং করে, মহালয়ায়ার আগের দিন, সুটকেস গুছিয়ে কোলকাতা বিমানবন্দরে সন্ধ্যেবেলা ওরা পৌঁছাল। মিত্রার ছেলে বাবুই দিদার আঁচল ধরে কতো কথা বকে যাচ্ছে। রাহুল মায়ের নতুন অ্যাডভেঞ্চারের কথায় লাফিয়ে উঠলেও রাতুল বিরক্ত মিত্রার কাণ্ডজ্ঞানহীনতায়। এই নিয়ে মিত্রার সাথে তার বেশ ঝগড়া হয়ে গেছে। বোঝাই যায়, উত্তর কোলকাতার গলি ছেড়ে তুস্কানি উড়ে গেলেও, কিছু লোক তার পূর্বপুরুষের গোঁড়া সংস্কার থেকে বেরতে পারে না। আবার মিত্রাও বুঝতে চায় না, সে ঘোড়ায় জিন দিয়ে থাকে বলে, যে সবাই থাকবে এমন কথা কোথাও লেখা নেই। তারপর, সাড়ে ১৭ ঘণ্টার উড়ান শেষে প্রজ্ঞাদেবী যখন বেইজিং বিমানবন্দরের বাইরে এলেন ,সত্যি বলতে কি; শরীর টানছিল না তাঁর। ভাগ্যক্রমে, দীপ্ত আগে থেকে উপস্থিত ছিল। সে তাঁকে নিয়ে হোটেলে গিয়ে চেক ইন করিয়ে দিল। যাওয়ার সময় বলল, “মাসিমা, ঘুমান। শরীর ঠিক লাগলে, রিসেপশন থেকে আমাকে একটা ফোন করে নেবেন।” বলে একটা প্রণাম করে সে চলে গেল। শুয়ে শুয়ে প্রজ্ঞাদেবী ভাবতে লাগলেন, “গতকাল মহালয়া ছিল। রাহুল রাতুল কি তর্পণ করেছে তাদের বাবার উদ্দেশ্যে? বেঁচে থাকতে মানুষটা খেতে কতো ভালবাসত। চা, বেলের পানা, ঘোল, লস্যি, ফলের রস, জলজিরা- মোদ্দা কথা, তেষ্টা নিবৃত্তির কোনও জিনিস বাদ রাখেননি। আর আজ প্রেতলোকে কি তিনি উপোসী, তৃষ্ণার্ত?”

পরের দিন প্ল্যানমতো দীপ্ত এল আর তার সাথে এল একটি মেয়ে। দীপ্ত বলল, “মাসিমা, এই হল লু মেইহুয়া। আমরা বলি মেই। আমার সাথে ও মিউসিয়ামে কাজ করে। ও আমাদের বেইজিংটা ঘোরাবে।” সাতসকালে এমন এক অনাহুতকে দেখে প্রজ্ঞাদেবী ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “বাবা দীপ্ত, আবার অন্য মানুষ কেন? আমরা দুজনেই তো ঠিক ছিলাম।” দীপ্ত হেসে বলল, “চিন্তা করবেন না। মেই প্যালেস মিউসিয়ামের রেজিস্টার্ড গাইড। ও ভালো ইংলিশ বলে।” মেই হেসে এগিয়ে এসে বলল, ” আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম। অনেক গল্প আমি জানি, বইয়ের পাতার বাইরের। আপনার মজা লাগবে।” পরবর্তী ৭ দিন মেই ভালোই ঘোরাল। সে নিজেও চিং সাম্রাজ্য নিয়ে পড়াশুনো করেছে। ফরবিডেন সিটির এত গল্প জানে, যে সব বলতে গেলে আর একটা ভ্রমণকাহিনী হয়ে যাবে। মেই যখন জানল প্রজ্ঞাদেবী ইতিহাসের গবেষক এবং শানক্সির মেইডেন হেয়ার গাছ দেখতে এসেছেন, সে তো খুশি হয়ে বলেই দিল, ” চানগান থেকে কাছে পড়বে গাছ টা। ওখানেই আমাদের বাড়ি। আপনি আমাদের গেস্ট। আমি মাকে বলে দেব।” প্রজ্ঞাদেবীর কোনও ওজর আপত্তি চলল না। অতঃপর অষ্টমীর দিন ওনারা শানক্সির চানগানের দিকে চললেন। দীপ্ত রয়ে গেল বেইজিঙে। প্রজ্ঞাদেবীর মন পড়ে কলকাতায়। বছর পাঁচেক আগেও এইদিনে কতো হইচই হত। রাহুল, রাতুল, মিত্রা, বউমা, জামাই, নাতি-নাতনি নিয়ে জমজমাট সংসার হত পুজোর কটা দিন।

চানগানের লুয়ানঝেনে মেইর বাড়ি। ওর মা গাও রুও থাকে শুধু বাড়িতে। কাঠের বেশ বড়ো একটা তিনতলা বাড়ি। একতলায় একটা রেস্তরা চালায় রুও। দোতলায় মা মেয়ের থাকার জায়গা। আর তিনতলায় দুটো বড়ো রুম, সামনে খোলা ছাদ সুদ্ধ। প্রতিটি রুমে সুন্দর করে গোছান। রুও বলেই দিল, “আমি ভালো করে রান্না করে দেব। আপনার যা দরকার ইন্টারকমে বলে দেবেন।” ব্যবস্থাটা বেশ সুন্দর। প্রজ্ঞাদেবী বেশ অভিভূত হলেন এরমধারা থাকাতে। মনে পড়ে, গৌতম যখন ঘোরাতে নিয়ে যেত, তুলোয় মুড়ে রাখত তাকে। বাড়ির অন্য বউরা আড়ালে বলত, “আদিখ্যেতা।” আজ যদি লোকটা জানত তার আদরের পারুল এরমভাবে অন্যকারুর ঘরে থাকছে, অনর্থ করে দিত। তাং সাম্রাজ্যের ওপরও বেশ দখল আছে মেয়েটার। শানক্সির ৬ দিন ওনার মনটাকে ভুলিয়ে দিল পুরো। মেই ওনাকে তাংদের ঐতিহাসিক স্থান দেখায়। রুও ওনাকে ডাম্পলিং বানানো শেখায়। তিল তেলে মিষ্টি ভাজে দুজনে। যদিও এই ঘরে হোটেলের বৈভব নেই, তবে আরাম আছে। কলেজে মার্ক্সবাদে এসবই ওদের প্রভাবিত করত না? মেই আর রুও বলেছে একদম পূর্ণিমার দিন মেইডেন হেয়ার গাছ দেখতে যেতে।

প্রজ্ঞাদেবীর এই প্রথম যেন মনে হচ্ছে তিনি ছুটি কাটাচ্ছেন। কোনও তাড়া নেই সাইট সিএংর। কোনও তাড়া নেই বার বার ছবি তোলার। কোনও চিন্তা নেই তিনটে সন্তানকে আগলাবার। হয়তো দশমীতে মায়ের বিসর্জনের সাথে সাথে বসুদের বাড়ির বড়ো বউয়েরও বিসর্জন বোধহয় হয়ে গেছে। মৈত্র বাড়ির ছোট মেয়েটাও বিসর্জিত অনেকদিন। তিনি শুধু প্রজ্ঞাপারমিতা এখন। আজ তো আবার বিকেলে রুও দোকান বন্ধ করে শপিং করাতে নিয়ে গেল। ঝুড়ি ঝুড়ি জিনিষ কিনলেন দুজনে মিলে। আজ ওনার খরচের হিসেব নেওয়ার কেউ নেই। রাতের বেলা ফিরে দেখেন দুজনে দরজার সামনে একজোড়া জুতো। পুরুষমানুষের। অপরাধী মুখ করে মেই জানায় একজন বয়স্ক লোক এসেছেন আমেরিকা থেকে। প্রজ্ঞার পাশের রুমে। রুওকে আশ্বস্ত করে প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আহা, কোনও অসুবিধে নেই। আমি তো আর দুদিন পর দেশে ফিরে যাবো। তোমরা শুধু কাল একটা গাড়ি দেকে দিও মেইডেন হেয়ার যাবার জন্য।” রাতে শোয়ার সময় একটা চাপা অস্বস্তি হল তাঁর। লোকটার উপস্থিতি ঠিক ভালো লাগছে না তাঁর।

ক্রমশঃ (To be continued)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ১)

“পারুল”, কাঁপা কাঁপা গলায় গৌতমবাবু ডাকলেন।
উল বুনতে বুনতে ওনার স্ত্রী উত্তর দিলেন, “উঁ?”
অধৈর্য্য হয়ে আবার বললেন, “ঐ পারুল।”
কাঁটাতে ঘর ফেলতে ফেলতে উত্তর এল, ” বলো গো?”
আদুরে গলায় গৌতমবাবু বললেন, “আমার একটা ইচ্ছে আছে।”
এবার পারমিতাদেবী নড়ে বসলেন। নরম গলায় বললেন, “কি গো?” ছোট্ট করে উত্তর পেলেন, “বিদেশ যাওয়ার।”
একগলা বিস্ময় নিয়ে পারমিতাদেবী বললেন, ” কি যে বলো! এই তো গতবছর তুস্কানি ঘুরে এলে রাতুলের কাছ থেকে।”
আবার ধৈর্য্য হারিয়ে গৌতমবাবু বললেন, “আমি তুস্কানির কথা বলছি না।” পারমিতাদেবী বললেন, “তাহলে? রাহুলের কাছে যাবে বলছ? এই শরীরে সার্ডিংহ্যাম যাওয়ার নামও আনবে না মুখে।”
স্ত্রীর গলায় রাগের পূর্বাভাস পেয়ে অশক্ত হাতে তার গাল ছুঁয়ে বললেন, “আমি আমাদের নিজেদের কথা বলছি গো। ছেলেরা তাদের মত থাক না। আমি তোমার হাতে হাত রেখে সোনার কার্পেটে হাঁটবো; চাঁদের আলোয়।”
হতভম্বের মতো দু মিনিট বসে থেকে পারমিতাদেবী মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠলেন, “মরণ, ঢং দেখো। নাতি নাতনি হয়ে গেছে আমাদের। এসব কি আমদের শোভা পায়? আমার কাজ আছে।”
“পারুল যেয়ো না। বস না আর একটু।” গমনদ্যত স্ত্রীর আঁচল ধরে আকুল গলায় বলে উঠলেন গৌতমবাবু।
নরম গলায় পারমিতাদেবী বলেন, “দাঁড়াও, তোমার ওষুধটা নিয়ে আসি।”
অবুঝ শিশুর মতো গৌতমবাবু বলে ওঠেন, ” সে আনবে’খন। আগে শোনো তো দেখি। বলতো দেখি কোন জায়গায় যাবো বলেছি? পারবে? জানি পারবে না। আমি তোমায় নিয়ে চীনে যাবো।”
“চীনে?” স্তম্ভিত পারমিতাদেবীর মুখে এরপর আর কথা যোগায় না।
“হে হে। কিচ্ছুটি জানো না। শানক্সিতে আছে একটা গাছ। মেইডেন হেয়ার ট্রি। কলেজ থেকে স্বপ্ন ছিল তোমাকে নিয়ে যাবো। তোমার ভালো লাগবে।” শিশুর মতো খিলখিলয়ে হেসে উঠলেন গৌতমবাবু।
স্বামীর বালখিল্যতায় পাল্লা দিতে না পেরে শ্লেষের গলায় বলে উঠলেন, “জানি তো। কলেজে মাও সে তুং তোমার বাবা ছিল।”
“আহা, শোনই না। গাছটা বড়ো অদ্ভুত। ১৪০০ বছর ধরে বেঁচে আছে। শরৎকালে পাতাগুলো সোনার হয়ে যায়। তোমাকে ঐ সোনাঝরা জায়গায় নিয়ে যাবো। লক্ষ্মীটি; রাগ কর না। এই একটি সাধ প্লিজ পূরণ করতে দাও।”

স্ত্রীঅন্ত প্রাণ মানুষটার প্রত্যেকটা শব্দে ঝরে পড়ছিল আকুতি। না, পারমিতাদেবীর কাছে না। নিয়তিদেবীর কাছে। তিনি জানতেন হাতে তাঁর আর বেশী সময় নেই। কেমো আর কাজ করছে না। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষ ঢুকে গেছে। তাও শেষ ইচ্ছে তাঁর পূরণ হয়নি.৩য় স্টেজ ক্যান্সারে ৫৭ বছর বয়সে থেমে গেছিল গৌতমবাবুর জীবনীশক্তি। আর তাঁর আদরের পারুল, যার পোষাকি নাম প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন কাজে। ৩৪ বছরের সঙ্গীর চলে যাওয়ার পর ৪ বছর কেটে গেছে। তুস্কানিতে বড়ো ছেলে রাতুল আর সার্ডিংহ্যামে ছোট ছেলে রাহুল নিজেদের বৃত্তে আবর্তন খায়। শুধু প্রথম সন্তান সঙ্ঘমিত্রা দেশের মাটির টান কাটাতে পারেনি। মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেও অধ্যাপিকা হয়েছে। ব্যাতিক্রম একটাই। সে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপিকা। আসলে, এ বাড়ির কেউই সায়েন্সের ধার ঘেঁষেনি। প্রজ্ঞাপারমিতা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। সৃষ্টিছাড়া সুন্দরী সে। গৌতমের সবচেয়ে আদরের ধন। অথচ মিত্রাকে নিয়ে চাপা অস্বস্তি একটা থেকে গেছে প্রজ্ঞাদেবীর মনে; সারাজীবন।

একদিন, মেয়ে দুম মাকে বলে বসল, “মা, বাবার শেষ ইচ্ছেটা কবে পূরণ করবে?”
একটা জার্নাল চেক করতে করতে ঘাড় তুলে প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “কোনটা?”
চশমাটা নাকের ডগায় তুলে মিত্রা বলল, “ওই সোনাঝরা গাছটার কাছে কবে যাবে?”
“পাগল হলি তুই মুনু?” প্রায় ‌ভৃত্সনার সুরে বলে উঠলেন প্রজ্ঞাদেবী, “আমি চলে গেলে স্টুডেন্টগুলোর কি হবে? বছরের মাঝে ছুটি নেওয়াটা অনৈতিক।”
“মা নিজের জন্য বেঁচেছ কোনোদিন?” মায়ের চোখে চোখ রেখে মিত্রা বলে উঠল, “সারাজীবন তো অন্যের জন্য মরলে।”
কথাটা ধ্বক করে প্রজ্ঞার বুকে লাগলো। একবারই তো বাঁচতে চেয়েছিলেন তিনি। নিজের মতো করে এবং গৌতম না থাকলে কেউ বাঁচাতে পারত তাকে সেই সময়।
“আজে বাজে কথা বোলো না মুনু।”, ধমকে উঠলেন প্রজ্ঞাদেবী।
কিন্তু মিত্রাকে তর্কে হারানো অতো সহজ না। এই গুণটা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া তার। মিত্রা বলে উঠল, “দেখো, কুরুশের কাঁটায় ক্লো‌ক বানানোতে তুমি সেরা। তাতে একটা তোমার একটা নাতি নাতনিকে শীতের জামা কিনতে হয় না। তোমার হাতের বানানো মুরগির রোস্ট পার্কস্ট্রিটকে হার মানায়। বাড়ির লোকের আবদার ফেলতে পার না তাই। মৈত্রম্যামের ক্লাস কেউ মিস করতে চায় না। কিন্তু এসবের মধ্যে প্রজ্ঞাপারমিতা কৈ? দ্যাখো, ভাইরা বিদেশে নিজের মতো বাঁচছে। আমি জয়কে নিয়ে সুখে আছি। আর তুমি? চুপচাপ জানলার ধারে বসে থাকো আর কাঁদো। অনেক হয়েছে আর না। আমি জয়কে বলে তোমার টিকেটের ব্যবস্থা করছি। তোমার এই চায়না ট্রিপটা দরকার।”
“মানে?”, প্রজ্ঞাদেবীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে।
“মানে দিন পনেরর ছুটি নিয়ে ঘুরে এস। আর এক বছর বাকি রিটায়ারমেন্টে তোমার। দাঁড়াও, জয়কে ফোন করি। ও হোটেল বুক করুক।”, মিত্রা ল্যান্ডলাইনে নম্বর ডায়াল করে বলে ওঠে, “হ্যালো, হ্যাঁ, আমি জয়ব্রত সেনের স্ত্রী বলছি।”
অসহায় চোখে দেখতে থাকেন নিজের মেয়ের কর্মতৎপরতা। মেয়ের এই ঝড়ের মতো কাজ করার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটা বার বার অস্বস্তিতে ফেলে তাঁকে। ও যেন বংশছাড়া।
অতঃপর প্রজ্ঞাপারমিতা দেবীর চিনযাত্রা শুরু হল। কোলকাতা থেকে উড়ান শুরু হল। গন্তব্য শানক্সি ; মেইডেন হেয়ার গাছ। তাং সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট তাইজংএর হাতে লাগান গাছ। গৌতমের স্বপ্নের জায়গা।

ক্রমশঃ (To be continued)