Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৬)

পরেরদিন একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠলেন ইন্টারকমের আওয়াজে। মেই ফোনে বলল, “আপনার শরীর ঠিক আছে? আপনি আজ রুমেই থাকুন। আমি ব্রেকফাস্ট টেবিল নিয়ে ওপরে আসছি।”
এলাহি আয়োজন ছিল ব্রেকফাস্টে। ছোট বাটিতে আদা দিয়ে ওয়ান্টন স্যুপ, মাংসের পিঠে, ছোট বাটিতে মেইফুন, একটা চৌকোণা অমলেট, কিছু সব্জি দিয়ে বানানো একটু ভাজা, ছোট বাটিতে ভাতের ওপর বাঁধাকপির আচার, তিলের নাড়ুর মতো দেখতে মিষ্টি।
প্রজ্ঞা দেবী বললেন, “একি! এত কে খাবে মেই?” মেই মিষ্টি হেসে বলল, “আপনি।” প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আমি তো আমিষ খাই না অনেকদিন।” পাকা গিন্নির মতো স্যুপে ফুঁ দিতে দিতে মেই বলল, “আজ খান। আপনার শরীরে জোর আসবে। মা এগুলো স্পেশালি আপনার জন্য বানাল।”
প্রজ্ঞাদেবী বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না যে তিনি বিধবা বলে আমিষ ছেড়ে দিয়েছেন। সংসারের চাপে লোকাচারের বিরোধিতা করা ঐ মেয়েটা মরে গেছে। তিনি সারাটা জীবন স্বামীর মঙ্গলকামনায় উপোষ করেছেন। অবশ্য মাঝখানে গৌতম টুক করে জল সাবু খাইয়ে দিত তাঁর হাজার বারণ সত্ত্বেও। ভক্তি করে ঠাকুরের কাছে মাথা নুইয়েছেন। মেয়ে আর ছেলেদুটোর জন্য পুজোপাঠ, জ্যোতিষের পাথর, বিয়ের আগে কুষ্ঠীবিচার কিচ্ছু বাদ রাখেননি। সারাজীবন মনে হয়েছে যদি তাঁর কৈশোর যৌবনে কেউ যদি একটা নীলার আংটি পরাত কি শ্বেতবেড়েলার মূল, তাহলে হয়ত জীবনে একটা বীভৎস দাগ থাকতো না। কিন্তু মেয়েটার মুখ চেয়ে মানা করলেন না। চুপচাপ খেয়ে নিলেন সবকটা।
মেই বলল, “একটা কথা ছিল ম্যাম, আজ কিন্তু ঝড় হতে পারে। খবরে বলেছে। সন্ধ্যের দিকে হবে। কাল আপনার ফ্লাইট ডিলে হতে পারে একটু। পারলে আজ দুপুরে মঠে চলে যান। আপনার পাশের রুমের লোকটা তো অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে ঘুরতে।” প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আচ্ছা। আজ বিকেলে শপিং ও করে নেব।”

বিকেলের পড়ন্ত বেলায় প্রজ্ঞাদেবী বাজার ঘুরে আরও কিছু গিফট নিলেন রুও আর মেইর জন্য। সারাদিন মন উচাটন হচ্ছে তাঁর। আকাশ গম্ভীর হতে শুরু করেছে। আর তাঁর মনে ঝড় চলছে কাল রাত থেকে। ৩২ বছর পর সিদ্ধার্থর সাথে দেখা হওয়াটা তাঁর এখনও হজম হচ্ছে না। কতো রাত তিনি কেঁদেছেন একটা সময়ে সিদ্ধার্থকে এক ঝলক দেখার জন্য। কত প্রার্থনা করেছেন যেন চোখ খুললে দেখেন, কোনও মন্ত্রবলে, সিদ্ধার্থ তাঁর পাশে দুষ্টুমি মাখা চোখে তাকিয়ে। কতোবার ব্যর্থ কল্পনা করেছেন ওর ঘুমন্ত মুখটা। তখন সেসব কিছুই পূর্ণ হয়নি। তাহলে আজ জীবনসায়াহ্নে কি করতে এলো সে? আইপডে গান বাজছে, “পুরনো সেইদিনের কথা।”

প্রজ্ঞা ক্লাসে বসে মন শক্ত করছে। সেদিনের পর দুদিন কেটে গেছে। কোনও লেকচার কানে ঢুকছে না। এক্সামের আর দুমাসও নেই। পাশ থেকে অসীমা ফিসফিস করে বলল, “গৌতমদার ওপর থেকে পুলিশ কেস তুলে নিয়েছে। বাড়িতে চলেও গেছে। তুই পারলে একবার দেখা করিস।”
জলে পড়ে থাকা মানুষ যেমন খড়কুটো ধরে বাঁচতে চায়, সেও সেই মুহূর্তে গৌতমকে হ্যাঙলার মতো অবলম্বন করতে চাইল। সন্ধ্যেবেলা সে যখন বাস থেকে নামলো, তলপেটর কাছে কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। মন শক্ত করতে চাইল প্রজ্ঞা একটুক্ষণের জন্য। গলার কাছটা শুকনো লাগছে তার। মনকে প্রবোধ দিল, ‘এত অপরাধবোধের কিছু নেই। গৌতম বন্ধু মাত্র। বন্ধুর কাছে সঙ্কোচের কিছু নেই।’ রাজা রাজবল্লভ স্ট্রীটের পাড়াটা চলছে নিজের তালে। বাড়ি থেকে কাঁসর ঘণ্টার আওয়াজ ভেসে আসছে। হাতে লেখা চিরকুট মিলিয়ে একটা বাড়িতে কড়া নাড়ল জোরে। উত্তেজনায় হাত কাঁপছে। একটি অল্পবয়সি স্কুলপড়ুয়া ছেলে দরজা ফাঁক করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে?” ছেলেটির চোখে সন্দেহ। পুলিশের চর নয়তো?
গলা খাঁকরে প্রজ্ঞা বলল, “নমস্কার। আমি প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র। গৌতমের জুনিয়র। দেখা করতে এসেছি একটু।”
কি ভেবে ছেলেটি বলল, “আসুন। বাইরের বৈঠকখানায় বসুন।”
কাঁপা কাঁপা পায়ে প্রজ্ঞা বৈঠকখানায় এসে বসল। সিদ্ধার্থর স্টাডির মতো বৈভব নেই; স্নিগ্ধতা আছে। ওকালতির বইও আছে সাহিত্যের পাশাপাশি। একটু পর ছেলেটি নেমে এসে বলল, “আসুন। দাদা ডাকছে ওপরে।” বড়ো একান্নবর্তী পরিবারের রাজপ্রাসাদের টানা বারান্দা পেরিয়ে যাচ্ছে সে। প্রাসাদই বটে বাড়িটা তার নিজের বাড়ির তুলনায়। দোতালার দক্ষিণের দিকের একটা ঘরে দেখল, গৌতম আধশোয়া হয়ে বসে আছে। প্রজ্ঞাকে দেখে মুখে ওর হাসি খেলে গেল। বলল, “ভাই, আমাদের একলা ছেড়ে দে একটু। দরজা টেনে দিস। অন্য কেউ যেন এখন আমাকে বিরক্ত না করে।”
ছেলেটি ঘাড় নেড়ে, দরজা টেনে চলে গেল।

প্রজ্ঞাকে বলল, “এসো। কাছে এসে বস। ও আমার জ্যেঠুর ছোটছেলে সৌরভ। আজকাল একটু কানে শুনতে সমস্যা হয়। ডাক্তার বলছে সেরে যাবে।” শুকনো মুখে প্রজ্ঞা এসে গৌতমের পালঙ্কে ওর পায়ের কাছে বসল। এই প্রথম ওর নাকে একটা অন্য রকম পুরুষালি গন্ধ এলো। দেখতে লাগলো গৌতমের শরীরটা। ব্যায়াম করা সুঠাম চেহারাতে মেদ জমেছে একটু। পাঞ্জাবির ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে একা রোমশ বুক। প্রশস্ত কাঁধের ওপর ব্যান্ডেজ জড়ানো। স্নিগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে গৌতম। নৈঃশব্দ্য ভেঙ্গে গৌতম বলল, “কি দেখছ পারুল অমন করে?”
প্রজ্ঞা চমকে তাকাল ওর দিকে। ওর স্বরে আগেও এমনি আদর মেশানো থাকতো?
সে বলল, “আমি বড্ড বোকা ছিলাম গো। তুমি জানতে সেদিন পুলিশ আমাদের মিছিলে লাঠিচার্জ করবে?”
গৌতম বলল, “হ্যাঁ। তোমার পড়া কেমন চলছে?”
শুকনো গলায় উত্তর এলো, “ভালো।”
তারপর একটা অসহ্য নীরবতা নেমে এলো গোটা ঘরে। শুধু দেওয়াল ঘড়িটা টিক টিক করে চলছে।

এমনি সময়ে প্রজ্ঞা বলে উঠল ব্যাকুল হয়ে,”আমি সিদ্ধার্থর সন্তানের মা হতে চলেছি। ওকে খবর দাও প্লিজ।”
গৌতমের মুখ দিয়ে বাক্যস্ফূর্তি হল না। অস্ফুটে বলল, “মানে?”
“সিদ্ধার্থ গত জানুয়ারির শেষের দিকে এসেছিল আমার কাছে। রাতে দেখা হয়েছিল। আমি তখনই……।”, কথা শেষ হওয়ার আগেই কাঁদতে কাঁদতে গৌতমের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল প্রজ্ঞা।
গৌতম চুপ করে বসে।
আর প্রজ্ঞা তার এতদিনের কান্না আজ উজাড় করে চলেছে।
দেওয়াল ঘড়ি একঘেয়ে সুরে টিকটিক করে চলছে। যেন মহাকালের প্রতিনিধি হয়ে ওদের সাক্ষী থাকছে। এমনি করে ঢং ঢং করে আটটা বেজে উঠল।
গৌতম বলল, “তুমি জানো সিদ্ধার্থ কোথায়?”
প্রজ্ঞা চোখ তুলে তাকাতেই বলল, “ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে ও ধরা পড়ে মালদায় গঙ্গা পেরতে গিয়ে। নক্সালের খাতায় নাম লিখিয়েছিল বহুদিন। আমরা জানতাম না। ওকে ওইদিন পুলিশে খুব মারে। তারপর কলকাতায় চালান করা হয় ওকে। ওর বাবা আইন ঘেঁটে, মুখ্যমন্ত্রীকে ধরে, ওকে রাজসাক্ষী করে বিদেশে পাঠায় গত মাসে। খুব সম্ভবত ও এখন প্যারিসে। ওকে ওখান থেকে অগাস্টে বার্লিনে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যতদিন না রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় ও ফিরবে না।”
প্রজ্ঞা স্তম্ভিত হয়ে সব কথা শুনে যাচ্ছিল। গৌতমের কথা গুলো যেন কান কেটে ওর মস্তিস্কে ঢুকছিল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল, “কি বললে?”
গৌতম বলল, “আগামী পাঁচবছরের আগে ও ফিরবে না। পিএইচডি শেষ করে ফিরবে।”
হঠাৎ প্রজ্ঞার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। এই স্বার্থপরের জন্য ও নিজের সম্ভ্রম খুইয়েছে? এই লোকটাতে সে ভালবেসেছে? এর জন্য নিজের পড়াশুনো বিসর্জন দিতে বসেছিল? ঘোর লাগা গলায় বলল, “আমি ডাক্তারের কাছে যাবো এখনই। আমি এই সন্তানকে চাই না। হয় এ শেষ হবে নয়তো আমি।”
প্রেতিনীর মতো উন্মত্ত হয়ে প্রজ্ঞা দরজার দৌড়ে যেতেই গৌতম ওকে পেছন থেকে আটকায়। জাপটে ধরে নিজের মধ্যে। প্রজ্ঞার মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে, “পারুল আজ বাড়ি যাও লক্ষ্মীটি। ঠাণ্ডা হও। আর একটি মাস সময় দাও আমাকে। তোমার অসম্মান হতে দেব না। তুমি শুধু পরীক্ষাটা দিয়ে দাও মন দিয়ে। ”

সে রাতে সৌরভ ট্যাক্সি করে প্রজ্ঞাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। এক মাস পর গৌতম ওর বাড়িতে নিজে এসে বিবাহ প্রস্তাব দেয়। তখন ওর রোজগার বলতে দুটো টিউশনি। দাদাদের অমতে, গৌতমের বাড়ির বিরোধিতার মাঝেও গৌতম তাকে বিয়ে করে। বিয়ের কয়েক মাস পরই ফলপ্রকাশ হয়। প্রজ্ঞা ক্লাসে প্রথম হয়। তাকে গৌতম ভর্তি করে মাস্টার্সে । আর তার মাস ছয়েক পর সে জন্ম দেয় এক ডাকসাইটে সুন্দরী শিশুকন্যার। প্রজ্ঞার মতো পটলচেরা চোখ আর সিদ্ধার্থর মতো টিকালো নাক।
মেয়েকে কোলে নিয়ে ক্লান্ত স্বরে সে বলে, “সঙ্ঘমিত্রা।”
গৌতম শুধোয়, “ও কি তাই চেয়েছিল?”
ঘুম জড়ানো স্বরে সে বলে, “হ্যাঁ।”
মেয়েকে কোলে গৌতম উচ্ছ্বাসে বলে ওঠে, “সঙ্ঘমিত্রা বসু। আমাদের প্রথম সন্তন। এই বাড়িতে প্রথমসন্তান মেয়ে কোনোদিন হয়নি। এ আমাদের লক্ষ্মী।”

সত্যই সে লক্ষ্মী। তার জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গৌতম পাশেই একটা স্কুলে চাকরি পায় ভূগোলের শিক্ষকের। শুধু সৌন্দর্য আর ভাগ্যের জোরে তার জন্মের অবৈধতার কথা চাপা পড়ে যায় ক্রমশ। সে তার বাকি দুই ভাইয়ের থেকে অনেক মেধাবী, অনেক যোগ্য। সে তার বাবার গর্বের বস্তু। গৌতমের মাত্রাছাড়া প্রশ্রয়ে বড্ড স্বাধীনচেতা হয়েছে সে।
অথচ তাকে নিয়ে প্রজ্ঞার অস্বস্তি কোনোদিন যায়নি। কিসের এত অহঙ্কার ছিল গৌতমের, নিজের স্ত্রীর অবৈধ সন্তান নিয়ে? কি প্রমাণ করতে চাইত? সে মহান? নাকি বন্ধুর প্রতি কর্তব্য? অস্বস্তি আজও পিছু ছাড়েনি তাঁর। জানলা দিয়ে দেখলেন আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। হাল্কা করে ঠাণ্ডা হাওয়া দিতে শুরু হয়েছে।

আগামী পর্বে সমাপ্য (Next part will be the last part)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ২)

সঙ্ঘমিত্রা তার মায়ের বেরানোর প্ল্যানটা ভালোই বানিয়েছিল। তবে অক্টোবরে কোলকাতার দুর্গাপুজো ছেড়ে কে যেতে চায়? তায় সময়টা ২০১০ সাল। তখনতো স্মার্টফোন সবে ঢুকেছে বাঙ্গালীর ঘরে। বিএসএনএল, এয়ারটেল ছাড়া তেমন কোনও ভালো সার্ভিস প্রোভাইডার নেই। ৪ জি ইন্টারনেট দূরঅস্ত ব্যাপার। জয় এসে প্ল্যান বোঝাল, “দেখুন মা, বেইজিংএ থাকবেন ৭ দিন। ওখানে আমার পুরনো বন্ধু থাকবে। ওর নাম দীপ্ত। ও আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দেবে আর ওইই গাইড এনে দেবে আর আপনার সাথে থাকবে।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “বাবা, ফরবিডেন সিটি ঘুরতেই তো ২ দিন লেগে যাবে।”
জয় বলল, “লাগুক না। তার পরের দিন, টেম্পল অফ হেভেন, জিংশান পার্ক, প্যালেস মিউসিয়াম ঘুরে নেবেন। আর বার্ডস নেস্ট স্টেডিয়ামটা মিস করবেন না”
তড়বড় করে মিত্রা বলে উঠল, “অতো ডিরেকশন দিতে হবে না মাকে। তুমি দীপ্তকে বলে দিও মা ওর কাছেই খেয়ে নেবে।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “ও মা! আমি তো চাইনীজ খাই রে মুনু।”
মিত্রা বলল, “আমরা বঙ্গ-চৈনিক ভার্সান খাই মা। ওথেন্টিক চীনে খাবার নাও খেতে পার তুমি।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “মুনু, আমি একলা যাবো না, ভয় করছে।”
মিত্রা বলল, “ভয় কাটাও মা। তুমি যাচ্ছ, আর হ্যাঁ পারলে আমার জন্য একটা ভালো হেয়ার পিন এনো তো।”
জয় বলল, “দীপ্তর বাড়ি থেকে আপনি কল করে নেবেন আমাদের। ওদের টাইম আড়াই ঘণ্টা এগিয়ে। আপনি ওদের লোকাল টাইম রাত সাড়ে ১০ টাতে ফোন করে নেবেন। চিন্তা করবেন না মা।”

একমাস ধরে এইসব প্ল্যানিং করে, মহালয়ায়ার আগের দিন, সুটকেস গুছিয়ে কোলকাতা বিমানবন্দরে সন্ধ্যেবেলা ওরা পৌঁছাল। মিত্রার ছেলে বাবুই দিদার আঁচল ধরে কতো কথা বকে যাচ্ছে। রাহুল মায়ের নতুন অ্যাডভেঞ্চারের কথায় লাফিয়ে উঠলেও রাতুল বিরক্ত মিত্রার কাণ্ডজ্ঞানহীনতায়। এই নিয়ে মিত্রার সাথে তার বেশ ঝগড়া হয়ে গেছে। বোঝাই যায়, উত্তর কোলকাতার গলি ছেড়ে তুস্কানি উড়ে গেলেও, কিছু লোক তার পূর্বপুরুষের গোঁড়া সংস্কার থেকে বেরতে পারে না। আবার মিত্রাও বুঝতে চায় না, সে ঘোড়ায় জিন দিয়ে থাকে বলে, যে সবাই থাকবে এমন কথা কোথাও লেখা নেই। তারপর, সাড়ে ১৭ ঘণ্টার উড়ান শেষে প্রজ্ঞাদেবী যখন বেইজিং বিমানবন্দরের বাইরে এলেন ,সত্যি বলতে কি; শরীর টানছিল না তাঁর। ভাগ্যক্রমে, দীপ্ত আগে থেকে উপস্থিত ছিল। সে তাঁকে নিয়ে হোটেলে গিয়ে চেক ইন করিয়ে দিল। যাওয়ার সময় বলল, “মাসিমা, ঘুমান। শরীর ঠিক লাগলে, রিসেপশন থেকে আমাকে একটা ফোন করে নেবেন।” বলে একটা প্রণাম করে সে চলে গেল। শুয়ে শুয়ে প্রজ্ঞাদেবী ভাবতে লাগলেন, “গতকাল মহালয়া ছিল। রাহুল রাতুল কি তর্পণ করেছে তাদের বাবার উদ্দেশ্যে? বেঁচে থাকতে মানুষটা খেতে কতো ভালবাসত। চা, বেলের পানা, ঘোল, লস্যি, ফলের রস, জলজিরা- মোদ্দা কথা, তেষ্টা নিবৃত্তির কোনও জিনিস বাদ রাখেননি। আর আজ প্রেতলোকে কি তিনি উপোসী, তৃষ্ণার্ত?”

পরের দিন প্ল্যানমতো দীপ্ত এল আর তার সাথে এল একটি মেয়ে। দীপ্ত বলল, “মাসিমা, এই হল লু মেইহুয়া। আমরা বলি মেই। আমার সাথে ও মিউসিয়ামে কাজ করে। ও আমাদের বেইজিংটা ঘোরাবে।” সাতসকালে এমন এক অনাহুতকে দেখে প্রজ্ঞাদেবী ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “বাবা দীপ্ত, আবার অন্য মানুষ কেন? আমরা দুজনেই তো ঠিক ছিলাম।” দীপ্ত হেসে বলল, “চিন্তা করবেন না। মেই প্যালেস মিউসিয়ামের রেজিস্টার্ড গাইড। ও ভালো ইংলিশ বলে।” মেই হেসে এগিয়ে এসে বলল, ” আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম। অনেক গল্প আমি জানি, বইয়ের পাতার বাইরের। আপনার মজা লাগবে।” পরবর্তী ৭ দিন মেই ভালোই ঘোরাল। সে নিজেও চিং সাম্রাজ্য নিয়ে পড়াশুনো করেছে। ফরবিডেন সিটির এত গল্প জানে, যে সব বলতে গেলে আর একটা ভ্রমণকাহিনী হয়ে যাবে। মেই যখন জানল প্রজ্ঞাদেবী ইতিহাসের গবেষক এবং শানক্সির মেইডেন হেয়ার গাছ দেখতে এসেছেন, সে তো খুশি হয়ে বলেই দিল, ” চানগান থেকে কাছে পড়বে গাছ টা। ওখানেই আমাদের বাড়ি। আপনি আমাদের গেস্ট। আমি মাকে বলে দেব।” প্রজ্ঞাদেবীর কোনও ওজর আপত্তি চলল না। অতঃপর অষ্টমীর দিন ওনারা শানক্সির চানগানের দিকে চললেন। দীপ্ত রয়ে গেল বেইজিঙে। প্রজ্ঞাদেবীর মন পড়ে কলকাতায়। বছর পাঁচেক আগেও এইদিনে কতো হইচই হত। রাহুল, রাতুল, মিত্রা, বউমা, জামাই, নাতি-নাতনি নিয়ে জমজমাট সংসার হত পুজোর কটা দিন।

চানগানের লুয়ানঝেনে মেইর বাড়ি। ওর মা গাও রুও থাকে শুধু বাড়িতে। কাঠের বেশ বড়ো একটা তিনতলা বাড়ি। একতলায় একটা রেস্তরা চালায় রুও। দোতলায় মা মেয়ের থাকার জায়গা। আর তিনতলায় দুটো বড়ো রুম, সামনে খোলা ছাদ সুদ্ধ। প্রতিটি রুমে সুন্দর করে গোছান। রুও বলেই দিল, “আমি ভালো করে রান্না করে দেব। আপনার যা দরকার ইন্টারকমে বলে দেবেন।” ব্যবস্থাটা বেশ সুন্দর। প্রজ্ঞাদেবী বেশ অভিভূত হলেন এরমধারা থাকাতে। মনে পড়ে, গৌতম যখন ঘোরাতে নিয়ে যেত, তুলোয় মুড়ে রাখত তাকে। বাড়ির অন্য বউরা আড়ালে বলত, “আদিখ্যেতা।” আজ যদি লোকটা জানত তার আদরের পারুল এরমভাবে অন্যকারুর ঘরে থাকছে, অনর্থ করে দিত। তাং সাম্রাজ্যের ওপরও বেশ দখল আছে মেয়েটার। শানক্সির ৬ দিন ওনার মনটাকে ভুলিয়ে দিল পুরো। মেই ওনাকে তাংদের ঐতিহাসিক স্থান দেখায়। রুও ওনাকে ডাম্পলিং বানানো শেখায়। তিল তেলে মিষ্টি ভাজে দুজনে। যদিও এই ঘরে হোটেলের বৈভব নেই, তবে আরাম আছে। কলেজে মার্ক্সবাদে এসবই ওদের প্রভাবিত করত না? মেই আর রুও বলেছে একদম পূর্ণিমার দিন মেইডেন হেয়ার গাছ দেখতে যেতে।

প্রজ্ঞাদেবীর এই প্রথম যেন মনে হচ্ছে তিনি ছুটি কাটাচ্ছেন। কোনও তাড়া নেই সাইট সিএংর। কোনও তাড়া নেই বার বার ছবি তোলার। কোনও চিন্তা নেই তিনটে সন্তানকে আগলাবার। হয়তো দশমীতে মায়ের বিসর্জনের সাথে সাথে বসুদের বাড়ির বড়ো বউয়েরও বিসর্জন বোধহয় হয়ে গেছে। মৈত্র বাড়ির ছোট মেয়েটাও বিসর্জিত অনেকদিন। তিনি শুধু প্রজ্ঞাপারমিতা এখন। আজ তো আবার বিকেলে রুও দোকান বন্ধ করে শপিং করাতে নিয়ে গেল। ঝুড়ি ঝুড়ি জিনিষ কিনলেন দুজনে মিলে। আজ ওনার খরচের হিসেব নেওয়ার কেউ নেই। রাতের বেলা ফিরে দেখেন দুজনে দরজার সামনে একজোড়া জুতো। পুরুষমানুষের। অপরাধী মুখ করে মেই জানায় একজন বয়স্ক লোক এসেছেন আমেরিকা থেকে। প্রজ্ঞার পাশের রুমে। রুওকে আশ্বস্ত করে প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আহা, কোনও অসুবিধে নেই। আমি তো আর দুদিন পর দেশে ফিরে যাবো। তোমরা শুধু কাল একটা গাড়ি দেকে দিও মেইডেন হেয়ার যাবার জন্য।” রাতে শোয়ার সময় একটা চাপা অস্বস্তি হল তাঁর। লোকটার উপস্থিতি ঠিক ভালো লাগছে না তাঁর।

ক্রমশঃ (To be continued)

Posted in Story

The Bird and The Moon

There was a bird, named Titir was calm one night. It was unusual for her not chirp unnecessarily.
Looking at her, the wind blew, “What happened to you?”
The dewdrop asked, hanging from a leaf, “What happened to you?”
The stars were gazing at her with the same question, “What happened to you?”
Leaving a sigh, she looked at the full moon on the sky. The moon asked her, “Tell me, dear, what happened?”

Titir shed a teardrop and said, “I always wanted to be caged with the chains called love. I fell in love with a tree at first. But he was in love with the river. After that, I flew to the arm of a sage hoping he would love me. He also denied to hold me. Next, I wanted to be by the side of a prince. But he was careless also. Now I want to be free from my desires. I want to challenge myself but I am too afraid to do so. But how can you be so glorious among the stars despite having so many scars?”

Looking at her, the moon smiled. With a loving gaze she said, ” My dear, it’s me who defined my worth. You always wanted to be recognised by others. But I made myself so strong that I never cared for anyone’s recognition. Fly away, my dear. It’s the pain which will make your wings stronger. The danger will make your claws sharper. And surely one day you will find your love who will be there beside you like the Sun always keeps me warm.”

Since that night, the Jungle never saw Titir. Legends say that maybe she found her love, another bird who was there beside her despite many danger because she challenged her wings once.