Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৭)

রাতে বেশি দেরি না করে রুও আর মেইর সাথে খেয়ে নিলেন। কিছু কিছু মানুষ থাকে যারা অতি অল্প সময়ের মধ্যে বড্ড আপন হয়ে যায়। এই যেমন এই মা আর মেয়ে। রুওর স্বামী অনেকদিন নিখোঁজ কোনও এক খনি দুর্ঘটনায়। সে নিতান্ত একটি সাধারণ গ্রাম্য মহিলা। কোনোরকমে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি বলে। ওর ইংরেজি শুনে মেই আর তিনি হাসি চাপতে পারেন না। তাও মহিলার ইচ্ছেশক্তির কোনও খামতি নেই। আজ চীনে প্রজ্ঞাদেবীর শেষরাত বলে ওরা দারুন আয়োজন করেছিল। বাবুইর জন্য একটা গিফট বানয়েছিল রুও। উনি আপ্লুত হয়ে গেলেন এত ভালবাসায়। সঙ্ঘমিত্রা ফোন করেছিল ডিনারটাইমে। পরেরদিন বিকেলে সিয়ান থেকে প্লেন ধরতে হবে। এই ছোট্ট পরিবার ছেড়ে ওনার যেতে মন করছিল না। তাও যেতে হবে। মাঝে একবার ইন্টারকমে ফোন এলো। মেই কথা শেষে বলল, “আমি চট করে ওপরের গেস্টকে ডিনারটা দিয়ে আসি। উনি কাল চেকআউট করবেন।” বেশ রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে প্রজ্ঞাদেবী নিজের ঘরে গেলেন। ঘুম আসতে চায়না। কানে আইপড লাগিয়ে ছাদে হাঁটতে বেরলেন। ততক্ষণে ঝড় ভালোই উঠেছে। কিন্তু তিনি তখন কিশোরীবেলায় ফিরে গেছেন। এমনি ঝড়ের সময় ছোড়দার সাথে আম কুড়োতে জেতেন চক্কত্তিদের বাগানে। কানে বাজছে মহিনের ঘোড়াগুলির গাওয়া ‘ভেবে দেখেছ কি তারারাও কতো আলোকবর্ষ দূরে’। এমনি সময়ে কাঁধে একটা আলতো চাপে তিনি চমকে উঠলেন। ঘাড় ঘোরানর আগেই শুনতে পেলেন, সেই অতিপরিচিত ভুলে যাওয়া কণ্ঠস্বরে, “মিতা, ঘরে এসো। ঠাণ্ডা লেগে যাবে।”

আবার পিঠ দিয়ে সেই চোরা স্রোত নেমে গেল। কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই কড়কড় করে বাজ পড়ল জোরে। আর ভয় পেয়ে তিনি আঁকড়ে ধরলেন মানুষটাকে। আঃ। কতোদিন পরে পেলেন সেই ঘ্রাণটা। সিগারেটের মতো নেশা ধরান ঘ্রাণ। সিদ্ধার্থবাবু টেনে নিয়ে গেলেন তাঁকে তাঁর রুমে। আর এমনি সময়ে আলো চলে গেল। ঘরের মধ্যে একটা দমচাপা অন্ধকার। একটু পরই মেই দৌড়ে এলো দুটো মোমবাতি নিয়ে। সিদ্ধার্থবাবুর ঘরে দুবার টোকা মারতে উনি বলে উঠলেন, “আমরা এখানে।”
মেই প্রজ্ঞার ঘরে এসে বলল, “সব ঠিক আছে? উনি সুস্থ তো? আসলে ট্রান্সফর্মারটা গেছে। আজ আলো আসবে না মনে হচ্ছে। আমি দুঃখিত।”
সিদ্ধার্থবাবু মিষ্টি হেসে বললেন, “ঠিক আছে। কোন ব্যাপার না। আমরা এরম ঝড় অন্ধকারে বেশী ভালো উপভোগ করি। উনি আমার কলেজের বন্ধু। তুমি চিন্তা কর না । আমরা একটু গল্প করব।”
মেই বলল, “ঠিক আছে। কিছু স্নাক্স দেব কি?”
সিদ্ধার্থবাবু বললেন, “না না। ঠিক আছে।”

মেই চলে যাওয়ার পর সিদ্ধার্থবাবু বললেন, “কেমন আছো মিতা?”
নেহাত অপরিচিত জায়গায় চেঁচামেচি করাটা তাঁর রুচিতে বাধে; তাই শান্ত স্বরে বললেন, “ভালো। তুমি এখানে কি করছ?”
সিদ্ধার্থবাবু হেসে বললেন, “ছুটি কাটাতে এসেছি। পুরো একমাসের ছুটি। বেইজিঙে এই মাসের শেষে একটা কনফারেন্স আছে।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আচ্ছা।” আলো-আঁধারিতে দেখছেন তাঁর হারিয়ে যাওয়া একদা প্রেমিককে। এই সেই সিদ্ধার্থ। যার ইচ্ছেকে সম্মান দিয়ে মেয়ের নাম রাখা হয়েছে সঙ্ঘমিত্রা। যার মুখের ছাপ নিয়ে সে জন্মেছে। যার দৌলতে সে মেয়ে অসাধারণ মেধাবী। বাবার মতই সে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়েছে। তারপর মার্কিনমুলুকে পাড়ি দিয়েছে সে। নিঃসন্দেহে মিত্রা একটা ঝোড়ো হাওয়া, ঠিক তার জন্মদাতা পিতার মতো।
সিদ্ধার্থবাবু জিজ্ঞেস করেন, “তুমি একা কেন মিতা? গৌতম কৈ?”
প্রজ্ঞাদেবী উত্তর দেন, “৫ বছর আগে আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে।”
আঁতকে উঠে সিদ্ধার্থবাবু বললেন, “সেকি? কি হয়েছিল ওর?”
উত্তর আসে, “প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার।”
পাঁচমিনিট পর সিদ্ধার্থবাবু বলেন, “তুমি কিন্তু এখনও আমার কথার উত্তর দিলে না। বললে না কেমন আছো।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “একলা বাঁচতে শিখে গেছি।”

বাইরে ঝড় বাড়ছে। তুমুল জোরে হাওয়া দিচ্ছে। ঘরের মধ্যে দুজনের মাঝে গুমোট ভাব। অভিযোগ সিদ্ধার্থবাবুর মনেও অনেক জমে ছিল একটা সময়ে। প্রজ্ঞা নামটা বিশ্বাসঘাতকের মত লাগত। পৃথিবীতে এত লোক থাকতে তাঁর বাল্যবন্ধুকে বিয়ে করাটা ক্ষমা করতে পারেননি তিনি কোনোদিন। ধীরে ধীরে সময় সব ভুলিয়ে দেয় বটে। কিন্তু কিছু ক্ষত শুকোয় না হয়তো। তাও আজ ৩২ বছর পরে এসব নিয়ে ঝগড়া করাটা মূল্যহীন। তাই কথা ঘোরাতে বলে বসলেন, “১৯৯৫ এ একটা ছাত্রী পেয়েছিলাম আমি। তখন আমি ওয়াশিংটনে। মেয়েটাকে পড়িয়ে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি হত। এত তর্ক করত থিওরি নিয়ে। আমি হাল ছেড়ে দিতাম ওর ওপর। রাগ উঠত ভীষণ। আবার ওকে দেখলে তোমার কথা মনে পড়ত বলে প্রশ্রয়ও দিতাম।” সন্ধিগ্ন গলায় প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “কি নাম মেয়েটির বলতো?”
“সঙ্ঘমিত্রা বসু। আমরা ঠিক করেছিলাম না মেয়ে হলে তার নাম দেব সঙ্ঘমিত্রা। ইউনিতে অনেকে ওকে ডেট করতে চাইত। আমি বিরক্ত হতাম। লোকে ভাবত আমি ওর প্রতি অনুরক্ত।”, বলেই হাহা করে হেসে উঠলেন তিনি, “ভাব মিতা, ঐ টুকু পুঁচকে মেয়ের সাথে নাকি আমি প্রেম করব!”
এইবার প্রজ্ঞাদেবী টানটান হয়ে বসলেন। উত্তেজিত গলায় বললেন, “সিদ্ধার্থ ও আমাদের মেয়ে। তুমি চিনতে পারনি?”
“মানে? কি বলছ তুমি?”, সিদ্ধার্থবাবু হতবাক হয়ে গেলেন।
“মনে পড়ে? সেই রাতটা?”, হাঁফাতে হাঁফাতে প্রজ্ঞাদেবী বলে উঠলেন, “তুমি সেই জানুয়ারির রাতে এসেছিলে আমার ছাদের ঘরে? তারপর স্বার্থপরের মতো দেশ ছেড়ে বেরিয়ে গেলে?”
“মিতা?!?”, কথা যোগায় না সিদ্ধার্থবাবুর মুখে।
“হ্যাঁ সিদ্ধার্থ, ও আমাদের মেয়ে। তোমার চলে যাওয়ার পর আমি যখন বুঝতে পাড়ি মুনু আমার পেটে, আমাকে তখন গৌতমই একমাত্র আশ্রয় দিয়েছিল। তুমি বার্লিন চলে গেলে দিব্যি। ফিরেও তাকালে না আমাদের দিকে।”, প্রজ্ঞাদেবীর গলার স্বর চড়ছে, “কেন করেছিলে? তুমি তো জানতে তোমার বোহেমিয়ান জীবনের কথা? তুমি তো জানতে আমি তোমার মতই সম্ভাবনাময় ছিলাম। ভাবনি কিছু না? ভেবেছিলে আমাকেও চুপ করিয়ে দিতে পারবেন তোমার বাবা। আমি তোমার খেলার পুতুল? জানতে চেয়েছিলে আমার কি হয়েছিল তারপর?” কান্নায় গলা বুজে আসে তাঁর। ৩২ বছরের সব কান্না, অভিমান, দুঃখ সব আজ বাঁধভাঙ্গা বন্যার মতো ঝরে পড়ে। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।

সিদ্ধার্থবাবু বিহ্বল হয়ে বসে রইলেন। এতদিন যা তাঁর কষ্টকল্পনা ছিল সঙ্ঘমিত্রাকে নিয়ে, আজ তা যে নগ্ন সত্যি হয়ে দাঁড়াল তাঁর সামনে, সেটার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেননা। তাঁর এই লম্বা অবিবাহিত, নিঃসঙ্গ জীবনে মিত্রাই ছিল খুশির হাওয়া একমাত্র। মিত্রাকে অপত্যস্নেহে আগলে রেখেছিলেন তিনি ইউনিভার্সিটিতে। মিত্রা তাঁর কাছে মন খুলে গল্প করত সব। ছুটির দিনে মিত্রাকে নিজের বাড়িতে ডেকে রান্না করে খাওয়াতেন। সেই মিত্রাই যে তাঁর আত্মজা এটা তিনি ভাবতে পারছেন না। ৫ বছর তাঁর একমাত্র সন্তান তাঁর কাছে ছিল। আর তিনি সেটা জানতেও পারেননি। কৈ প্রজ্ঞার এই কথা তো তাঁকে কেউ জানায়নি। তিনি কতো চিঠি লিখতেন ইউনিয়নের পুরনো বন্ধুদের। কেউ প্রজ্ঞার কোনও খবর দিতে পারেনি। শুধু কেউ একবার লিখেছিল প্রজ্ঞার বিয়ে হয়ে গেছিল। ভুয়ো খবর ভেবে সেই চিঠিকে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। সর্বপরি গৌতমতো একটি বাক্যও খরচ করেনি প্রজ্ঞার সন্তান নিয়ে। প্যারিসে বসে কতো চিঠি লিখেছেন প্রজ্ঞার কাছে, গৌতমের ঠিকানায়। ছবি পাঠাতেন, আইফেল টাওয়ার আর সিননদীর লভলক ব্রিজের। এমন কি ১৯৭৩ র জুনে তাঁর আর প্রজ্ঞার নাম লেখা তালা ঐ ব্রিজে বেঁধে চাবি ছুঁড়ে ফেলে দেন নদীতে। সেটারও ছবি পোস্ট করেছিলেন গৌতমের ঠিকানায়। তিনি জানতেন সরকার তাঁর সব চিঠির ওপর নজরদারি করবে। হোক। তাও লিখতেন। এমনকি আংটিও কিনেছিলেন বিয়ের জন্য। শুধু সে বছর দুর্গাপুজোর সময় তাঁর মার আকস্মিক মৃত্যুর জন্য স্পেশাল পারমিশনে দেশে ফেরেন। শেষকৃত্য সেরেই গৌতমকে খবর দেন নিজের উপস্থিতির। তারপর?

সিদ্ধার্থবাবু ধরা গলায় বলেন, “গৌতম তোমাকে কোনও চিঠি দেয়নি আমার?”
প্রজ্ঞাদেবী বলেন, “কি বলছ?”
“চিঠি। আমি প্রত্যেক সপ্তাহে চিঠি লিখতাম তোমায় গৌতমের ঠিকানায়। ছবি পাঠাতাম প্যারিস থেকে। আমি সে বছর অক্টোবরে ফিরেছিলাম দেশে। তুমি জানতে না মিতা?”, আকুল গলায় সিদ্ধার্থবাবু বলেন।
“কি বলছ তুমি?”, প্রজ্ঞাদেবীর মুখে কথা যোগায় না।
দুহাতে প্রজ্ঞাদেবীকে ঝাঁকিয়ে বলেন, “গৌতম তোমাকে কিছু বলেনি?”
প্রজ্ঞাদেবী বলেন, “গৌতম তো আমাকে কোনোদিন বলেনি তোমার সাথে দেখা করার কথা। কোনোদিন চিঠির কথা বলেনি। তোমার সাথে সে যোগাযোগ ছিল সে তো আজ জানলাম।”
সিদ্ধার্থবাবু বলে চলেন, “সে দেখা করল আমার সাথে সে বার। সেই বলল তুমি ওকে বিয়ে করে নিয়েছ। বলেছিল তুমি ওকে ভালোবাসো। আমার থেকেও বেশি। বড়ো আঘাত পেয়েছিলাম আমি, জানো? ভেবেছিলাম তুমি ঠকালে আমাকে। অনেকবছর কেটেছে তোমাকে ঘেন্না করে। সংসার পাতিনি আর তারপর।”
প্রজ্ঞাদেবী কেঁদে উঠে বলেন, “ভুল সিদ্ধার্থ, সব ভুল, সব মিথ্যে। গৌতম আমাকে বিয়ে করেছিল মুনুকে পিতৃপরিচয় দিতে। নয়তো আমাকে আত্মহত্যা করতে হত।” নেশাগ্রস্তের মতো বলে চলেন, “কিন্তু সারাজীবন ও আমার বন্ধু ছিল শুধু। তোমার পর কাউকে আমি ভালোবাসিনি। আজও তোমাকে আমি ভুলিনি সিদ্ধার্থ। এভাবে গৌতম আমাদের আলাদা করে দিল?”

বাইরে তখন বৃষ্টি ধরে এসেছে। জীবনসায়াহ্নে দাঁড়িয়ে দুই প্রৌঢ়র পায়ের তলার মাটি সরে গেল পুরো। সিদ্ধার্থ, মিত্রা আর প্রজ্ঞা একটা সুখী পরিবার হতে পারত। হয়তো বার্লিনে মেয়েটা ছোট ছোট পায়ে দৌড়াত, প্রজ্ঞা বকুনি দিত। হয়তো, ওয়াশিংটনের বাড়িতে বাবা মেয়ে মিলে ঘাস কাটতেন ছুটির দিনে। মেয়ে ঘরে হয়ত লুকোনো প্রেমপত্র পেতেন। হয়ত কোলকাতায় তিনজনে সাধারণ বাঙ্গালীর মতো জীবন কাটাতে পারতেন। জামাইষষ্ঠীর বাজার করতে ছুটতেন জ্যৈষ্ঠের গরমে। কতো স্বপ্ন, কতো প্রতিজ্ঞা, কতো মান-অভিমান, কতো আবেগ, কতো চাওয়া পাওয়া সব ভেসে গেল একটা মানুষের জন্য; যাকে তাঁরা সবচেয়ে বেশী ভরসা করেছেন সারাজীবন। হঠাৎ সিদ্ধার্থবাবু প্রজ্ঞাদেবীকে জড়িয়ে ধরলেন সেই পুরনোদিনের মতো। এই মুহূর্তে আর কোনও রাগ নেই, কোনও ঘেন্না নেই, কোনও তৃতীয় ব্যাক্তি নেই। এই মুহূর্তটা একান্তই তাঁদের দুজনের। বয়স হয়ে গেছে দুজনের, তাও আবেগ রয়ে গেছে ১৯৭৩ র জানুয়ারির রাতের মতো। আচমকা প্রজ্ঞা তার ঠোঁট রাখে সিদ্ধার্থর ঠোঁটের ওপর। এ চুম্বনে ছিল না কোনও কাম। এ চুম্বনে জড়িয়ে ছিল স্নিগ্ধতা, ভরসা, প্রেম।
সিদ্ধার্থ গাঢ় স্বরে বলে, “মিতা।”
ওর বুকে মাথা রেখে প্রজ্ঞা বলে ওঠে, “বোলো।”
“আমাদের প্রেমটা ফসিল হয়ে গেছে না?”, সিদ্ধার্থ বলে ওঠে।
আলতো হেসে ক্লান্ত স্বরে প্রজ্ঞা বলে, “না বোকা। কোনদিনও ফসিল হয়ে যায়নি। শুধু লিভিং ফসিল হয়ে রয়ে গেছে দুজনের মনে।”
বাইরে তখন মেঘ কেটে পূর্ণিমার চাঁদ উঠে গেছে। মেইডেন হেয়ার গাছ থেকে পাতা খসে খসে তখন সোনালি কার্পেট তৈরি হচ্ছে।”

সমাপ্ত।

* মেইডেন হেয়ার গাছ হল একটি Ginkgo Biloba গাছ। এই প্রজাতিটি একটি লিভিং ফসিল। অর্থাৎ বহুপুরনো সময় থেকে পৃথিবীতে টিকে আছে অবিবর্তিত হয়ে। আনুমানিক ২৯ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে আছে প্রজাতিটি।

Posted in Poetry

নিভৃতবাস

এ কেমন নিভৃতবাস?
আমি গুমরে মরি আমার কক্ষপথে।
আমার ক্লান্ত শরীর টেনে চলে,
একটা কালো ব্যাগকে।

এ কেমন নিভৃতবাস?
রোজ রাতে আঁচড় কাটি আমার বালিশে।
আমি শূন্যমনে শুনতে থাকি
স্তাবকের নালিশ।

এ কেমন নিভৃতবাস?
আমি হাফিয়ে উঠি একলা ফ্ল্যাটে।
প্রতিদিন মায়ের ফোন হয় আরও সংক্ষিপ্ত;
আর প্রেমিকেরটা ক্রমশ অদৃশ্য।

এ নিভৃতবাস বড়ো বিসদৃশ।
আমি সুস্থ অথচ অস্পৃশ্য।
আর জিজ্ঞাসে না কেউ আমার কথা।
ভালোবেসে বলে না কেউ “কেমন আছো?”

অথচ একবিংশের পৃথিবী থাকে আপন মনে
প্রতিটি মানুষ নিজের মতো নিভৃতে, আপন কক্ষপথে।
নিজের মুঠোফোনে বন্দী এক অলীক জগতে,
রাত জাগে তারা অচেনা মানুষের চ্যাটবক্সে।

একবিংশের পৃথিবীতে প্রেমিকরা আসে না করবী নিয়ে,
একবিংশের পৃথিবীতে স্বীকৃতি আসে মোটা মাইনেতে।
একবিংশের পৃথিবীতে আছে শুধু কাঠিন্য,
একবিংশের পৃথিবী বড়ো ধূসর, বড়ো নিষ্ঠুর, বড় ব্যর্থ।

দিন ফুরিয়ে যায় ক্রমশ;
ফুরিয়ে আসে কাজ, সিনেমা, গল্পের বই।
মাথার মাঝে কথারা বুনতে থাকে জাল।
রাত বাড়ে, আমি ঘষে দিই শেষ সিগারেট।
আর আমার একলাবাস কাটতে থাকে এভাবে,
একটু স্পর্শের আশায়।

Posted in Scribbled Thought

কলকাতা ভালো আছো?

প্রিয় কলকাতা,
ভালো আছো? জানো আজ তোমাকে বড্ড মনে পড়ছে। মনে পড়ছে, প্রথম যেদিন তোমার কাছে এলাম, সেই দিনটা। আমার মন এতোটুকু ভালো লাগেনি। তোমার প্রতি একটা বিতৃষ্ণা জন্মেছিল অনেক ছোট থেকেই। আসলে মফঃস্বলের মেয়ে তো, ভয় ছিল লোকে যদি হ্যাঁটা দেয়। বড় হয়েছি, পড়াশুনো করতে চলে গেছি ভুবনেশ্বরে। জানো, ওখানের মাটিটা বেশ লাল; ঠিক মেদিনীপুরের মত। ৭ টা বছর কাটিয়েছি ওখানে। তোমার মত অতো কোলাহল নেই। বেশ স্নিগ্ধ শহর। আবার শ্রীক্ষেত্র কাছে ওখান থেকে। তারপর জীবিকার টানে তোমার কাছে আসা।

জানো তিলোত্তমা, সেইদিনটা জুন মাসের মাঝামাঝি বা শেষ হবে। খুব বৃষ্টি পড়ছিল। আমি আমার পোর্টফলিও হাতে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি। পাশে মা বসে। নাগপাশের মত সারাজীবন জড়িয়ে রেখেছে আমাকে। ইন্টারভিউ হয়ে গেল। আমার নতুন চাকরি পাকা তখন। ১৫ দিন পর জয়েনিং। আমার আজো মনে আছে, প্রভম বলেছিল, ‘দিদি কংগ্রাচুলেশনস। ফাটিয়ে দিয়েছ তো।’ বিশ্বাস কর কোলকাতা, আমার একটুও ভালো লাগেনি। ভালো লাগেনি তোমার প্যাঁচালো পরিবেশ। ভয় ছিল, এখানে মানাবো কি করে? এখানে তো আমি বেমানান। রাস্তাঘাটের গাড়িঘোড়া বড্ড ভয়ঙ্কর। যাই হোক, আমার চাকরিজীবন শুরু হল।

ও বাবা, অফিসে গিয়ে দেখি, আমিতো একদম হংস মধ্যে বক যথা। বাঙালি হয়ে ফুটবল জানিনা। মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গলের জার্সি গুলিয়ে ফেলেছিলাম বলে সেকি হাসাহাসি অফিসে। আমি বাঙলা সিনেমা দেখিনি। বাংলা গানে কোনো উৎসাহ নেই। আমি কথায় কথায় ‘বাল’ বলতে পারি না। আমি গালিটা ইংলিশে দিতাম। আমি তো কোরিয়ান ফিল্মের ভক্ত। আমার ভাণ্ডারে ইংলিশ গানের সংগ্রহ। আমরা ‘গেম অফ থ্রোনস’, ‘বিগ ব্যাং থিওরি’ এসব দেখতাম। স্বাভাবিক, ভুবনেশ্বরের হস্টেলে সব চলত। আর গোটা সময়ই আমি কাটিয়েছি বিহারি রুমমেটের সাথে। মেয়েটা আজ অনেক বড় জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। অসাধারন গান গাইত আর হাতের কাজ জানত। তারপর দেখলাম বাঙ্গালিকে সাধে কাঁকড়ার জাত বলেনা। আমার পিজির মাসি শুরুতে বড় মিস্টি কথা বলেছিল। কিন্তু বাস্তবে ব্যাবহার ভালো না। তারপর শুরু হল আমার মনের মানুষ খোঁজা। মুঠোফোনের দৌলতে এক আশ্চর্য প্রদীপ পেলাম। তাতে রোজ নতুন লোকের সন্ধান পাই। শুনেছিলাম তুমি প্রেমের শহর। তোমার ব্যাপ্তিতে ছড়িয়ে আছে প্রেমিকের আলিঙ্গন। সেখানেও চরম ঠকে গেলাম। হায়! প্রেমিক কই? সব তো পুরুষ। যারা প্রতি মুহূর্তে জরিপ করে দেহসৌষ্ঠব। কেউ বা শুধু প্রেমের স্বপ্ন দেখায়। জানো তিলোত্তমা, তোমাকে আরও ঘেন্না হত।

তারপর একদিন একটা মানুষের সাথে আলাপ হল। মানুষটাকে বড্ড আত্মঅহঙ্কারি লেগেছিল। ঠোঁটে সিগারেট আর চায়ের অসম্ভব নেশা। আমাকে বলেছিল, “আপনি কোনদিন কফিহাউসে গিয়েছেন? বা অঞ্জন দত্তের গান শুনেছেন? পুরো নস্টালজিয়া।” মানুষটা তোমাকে ভালবাসতে শেখাল।
আমি বলতাম শবরবাবু আর আমাকে বলতেন জগবন্ধু। আমাকে প্রথমবার কুমারটুলী নিয়ে গেল সে। কাশী মিত্তিরের ঘাট পেরিয়ে আমরা হাঁটতাম আহিরীটোলার ঘাটের দিকে। গঙ্গার জলে পা ডুবোতাম। হাওড়ার দিক থেকে ভেসে আসতো আরতির ঘণ্টার আওয়াজ। শবরবাবু আমাকে নিয়ে গেছেন নন্দনে, প্রিন্সেপ ঘাটে, উত্তর কোলকাতার অলিগলিতে। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখেছি তোমার সৌন্দর্যে। রবীন্দ্র সরোবরে চা আর পাপড়ি চাট খেতে খেতে তর্ক করেছি কত। আজো ভুলিনি বাগবাজারের ছানার ডালনা; কি কেবিনের অসাধারন ভেটকি ফ্রাই। আজও ভুলিনি সেই দিনটা যেদিন আমি আর উনি আবিরকে দেখবো বলে চা ফেলে দৌড়েছিলাম।
কোলকাতা, তারপর এল আমার আরেক বন্ধু। তার হাত ধরে প্রথম থিয়েটার দেখলাম। যাদবপুরের ফুটপাথে বসে চা আর মোমো। দুঃখের সময়ে আশ্রয় পেয়েছি তার কাছে। কত দুষ্টুমির সাক্ষী থেকেছ আমাদের। বুঝিনি কখন আমরা মনের কাছাকাছি এসে পড়েছি। একটা নতুন সম্পর্ক এল আমার জীবনে। এই প্রথম একটা দাদা পেলাম। একটা সত্যি দাদা। আর ছিল বেহালায় আমার সখা। যার সাথে আড্ডায় বসলে কারুর সময়ের আর সিগারেটের হুঁশ থাকতো না। কিংবা আমার সেই ফোটোগ্রাফার বন্ধু; যার সাথে কাঠগোলায় ফুচকা খেতাম। তার সাথে পার্কের বেঞ্চিতে কাটিয়েছি কত বিকেল গল্প করে।

আজ তোমাকে বড্ড মনে পড়ছে কোলকাতা। কেমন আছো? আজ একটা মারণ রোগে পৃথিবী ভুগছে। আমি আজ ২ মাস গৃহবন্দী। শবরবাবুও বন্দী। শুধু আমার দাদাটা দৌড়ে বেড়াচ্ছে রোগীর কাছে কাছে। সেতো ডাক্তার, তার তো বন্দিত্ব নেই। ওগো তিলোত্তমা, আমি আবার আহিরীটোলার ঘাটে বসতে চাই। আমি যাদবপুরের ফুটপাথে চা খেতে চাই। আমি সল্টলেকের রাস্তায় হাঁটতে চাই। দেখতে চাই ওইখানের আমগাছগুলোতে কেমন আম হল? এখন আর তুমি দুরূহ উপন্যাস নও কোলকাতা। এখন চিনে গেছি বাসগুলো। আমি মিস করছি আমার রোববারের সকালের মর্নিং শো। কালিকাপুরের রাস্তায় কেমন ফুল ফুটেছে, জানতে মন করছে বড্ড। আচ্ছা শঙ্কুদা কি এখনও অমনি গাঢ় চা বানায়? বড্ড মিস করছি, এসি ৩৭এ করে নিউটাউন যাওয়াটা। কোলকাতা, জানতে মন করছে পার্কস্ট্রিটে, মেট্রো স্টেশনের কাছের মুচিটার দিন চলছে কি করে কিংবা গড়িয়ার ওই ধোপাটা, যে যত্ন করে আমার জামা ইস্ত্রি করত। আজো ভুলিনি বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া সেই দিনটা, ওর সাথে প্রথম দেখার দিন। অজান্তে ওকে ভালবাসতে বাসতে, কখন তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি, বুঝতে পারিনি। আজ সে আমার জীবনে অতীত কিন্তু তুমি বেঁছে আছো প্রবলভাবে।

ভালো থেকো কোলকাতা। তোমাকে আবার জড়িয়ে ধরব দুহাতে। আবার ঘুরে আসব অনেক জায়গা। রাস্তা ভুলে গেলে চায়ের দোকানে ঠিকানা জেনে নেব। দৌড়ে ধরে নেব বাস। বাড়ি ফেরার তাড়া থাকলে মেট্রো কার্ড ঘষে পাতাল ফুঁড়ে উঠে আসব। আবার আমি সূর্যাস্ত দেখবো নৌকায় বসে; হয়তো নতুন কারুর সাথে।
ততদিন ভালো থেকো।
ইতি
তোমার এক প্রেমিকা