Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৫)

সে রাতে কিছুতেই ঘুমোতে পারলেন না প্রজ্ঞাদেবী। এভাবেও মানুষ ফিরে আসে? ৩২ বছর পরে? তাঁর আইপডে গান বাজছে, ‘আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী’।
১৯৭৩ সালে মানু রায় ক্ষমতায় চলে এসেছে। নক্সাল আন্দোলন তখন তুঙ্গে। পুলিশ রোজ শুটআউট করছে। প্রবীরের লাশ উদ্ধার হল গড়ের মাঠ থেকে। সুনিতা ইন্টারোগেশনের চোটে পাগল হয়ে গেছে। কলেজের দেয়ালে পোষ্টার পড়ে, ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান।’ প্রজ্ঞা সব কিছুতে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। সে ততদিনে ফাইনাল ইয়ার স্টুডেন্ট। আজ ৪ মাস সিদ্ধার্থের দেখা নেই। রাগ জমে। অভিমানে ওর গলা বুজে আসে।
“দ্যাখো পারমিতা। অতো ভেব না। ও এরমই ক্ষ্যাপাটে বরাবর।”, চায়ে চুমুক দিতে দিতে গৌতম বলে।
“কিন্তু এরমভাবে না বলে উধাও হওয়াটা কোন দেশি সভ্যতা গৌতম?”, প্রজ্ঞা বিরক্ত। কফি হাউসে মান্না দের গান বাজছে।
“দ্যাখো পারমিতা, তোমার পড়াশুনোয় মন দাও। সেকেন্ড ইয়ারে ৫০% মার্কস তুলেছ। এগুলো কি হচ্ছে?”
“সে তোমায় নিতে হবে না। কিন্তু মানু রায়ের টর্চারও নেওয়া যায় না।”
“নিতে হবে না। তুমি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িও না। এটা ফাইনাল ইয়ার। প্লিজ, ৬০% র ওপর মার্কস আনো।”
“ছিঃ গৌতম! তুমি বামপন্থী হয়েও আমাকে বলছ শ্রেণীশত্রুকে পিঠ দেখাব?”, প্রজ্ঞার গলায় ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে।
“হ্যাঁ, বলছি। তুমি মেধাবী। আমি চাই না গড়ের মাঠ থেকে তোমারও লাশ উদ্ধার হোক। আমি চাইনা তোমার মেধাটা নষ্ট হোক।”, অজান্তে গৌতমের গলাটা চড়ে যায়।
“অসভ্যের মতো চেঁচিয়ো না গৌতম।”, প্রজ্ঞারও গলাটা ওঠে।
“তুমি এই রোববারের মিছিলে যাবে না; ব্যাস।”, ছায়ের কাপটা নামিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে গৌতম।
“তুমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কে?”, প্রজ্ঞা উদ্ধত হয়ে ওঠে।
“আমি ইউনিয়ন লিডার, কমরেড গৌতম বসু।”, রায় শুনিয়ে দেয় সে।
থম্থমে মুখে প্রজ্ঞা বসে থাকে। কফি জুড়িয়ে যায়। ফিশফ্রাই ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

সেই রোববারটা ছিল অসহ্যরকম দীর্ঘ। খবর এসেছিল, রাইটার্সের সামনে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। লাঠি চার্জ, জলকামানও চালানো হয়েছে মিছিলের ওপর; যে মিছিলের পুরোভাগে ছিল গৌতম। দাদারা তাকে ঘরবন্দী রেখেছিল। সারাদিন প্রজ্ঞা ছটফট করেছে। সিদ্ধার্থ নেই পাশে। যদি গৌতমের কিছু হয়? পরেরদিন খবর কাগজে বেরোল সেই মিছিলে ১০ জন নিহত, ৩০ জন গুরুতর আহত। আহতরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি। গৌতমের রক্তাক্ত ছবি ছিল প্রথম পাতায়। প্রজ্ঞা আছন্নের মতো ক্লাসরুমে বসে থাকে। গৌতম তাকে এভাবে বাঁচালো?!
ক্যান্টিনে অনীশ এসে খবর দেয়, “প্রজ্ঞাদি, গৌতমদা ভালো আছে মোটামুটি। খবর পেয়েছি।”
প্রজ্ঞা ওর হাত চেপে ধরে বলে, “আমাকে নিয়ে চল।”
অনীশ বলল, “পাগল নাকি? গেলেই সাদা পোষাকে থাকা পুলিশ ধরবে। তুমি আজ বাড়ি যাও।”
সেই মুহূর্তে বড়ো শীত করছিল প্রজ্ঞার; বড়ো অসহায় বোধ করছিল ও।

এই ঘটনার পর একমাস কেটে গেছে। সে বড়ো শান্ত হয়ে গেছে। প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরিয়ে নিয়েছে নিজেকে।কেবল উদ্বাস্তুদের সাহায্য করাটা বন্ধ করেনি। গৌতম হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে গেছে। কিন্তু ওর ঘোরাফেরা বারণ। নক্সাল সন্দেহে প্রায়ই পুলিশের চর সাদা পোষাকে ওদের গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। সিদ্ধার্থর সাথেও তেমন দেখা হয় না। সর্বদা ও যেন ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত। ওর বাবা শাসক ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ছেলের অবাধ ঘোরাফেরায় বাধ সেধেছেন। নক্সালদের লিস্টে বাপ-বেটার নাম ওঠার ভয় তো আছেই। মাঝে মাঝে নিজের ডেস্কে অনামি খামে সিদ্ধার্থর চিঠি পায়। কিন্তু তাকে এখন আর কিছুই স্পর্শ করে না। ওর সামনে পরীক্ষা । গৌতমতো এটাকেই তো পাখির চোখ করতে বলেছিল। মাঝে মাঝে একা ঢাকুরিয়া লেকে বসে থাকে। সিদ্ধার্থর মুখটা আবছা হয়ে যাচ্ছে কি? ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে মাঝে মাঝে। ওর শরীর উন্মুখ হয়ে থাকে সিদ্ধার্থর ছোঁয়ার আশায়। মনে পড়ে সিদ্ধার্থর ঘামে ভেজা গায়ের গন্ধটা, ওর চোখ, ওর টিকালো নাক; সর্বোপরি ওর আগুনের মতো সর্বগ্রাসী ভালোবাসাটা। সব মিলিয়ে গেছে ওর জীবন থেকে। প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র স্তিমিত হয়ে গেছে।

ক্রমে সময় কেটে যায়। আরও ৪ মাস অতিক্রান্ত। সংসার বড়ো হয়েছে। বড়দার স্ত্রীবিয়োগ হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুকালে একটি ছেলের দায় চাপিয়ে গেছেন। মেজদা ও সেজদার একমাসের ব্যাবধানে পর পর বিয়ে হল। ছোড়দা চলে গেছে বম্বে চাকরি নিয়ে। প্রতিমাসে নিয়ম করে খামে করে টাকা আসে। বাবারও অবসরের সময় হয়ে এল। সব কথা ভেবেই টালিগঞ্জের বাড়িটা দোতালা করা হয়েছে সদ্য। এখনও বাইরেটা চুনকাম করা বাকি। প্রজ্ঞার পড়ার কথা ভেবে ছোড়দার পরামর্শে ছাদে একটা সুন্দর শৌখিন ঘর বানানো হয়েছে। প্রজ্ঞা পারতপক্ষে ঘর ছেড়ে বেরয় না। গ্র্যাজুয়েশনের পর সে কি করবে ভাবতে থাকে। সেজদার শ্বশুরবাড়ির দিকে কয়েকটা সুযোগ্য পাত্র আছে। সিদ্ধার্থর তরফে আর কোনও যোগাযোগ নেই। এমনি এক শেষ জানুয়ারির রাতে প্রজ্ঞার দরজায় টোকা পড়ে। ঘড়িতে তখন রাত ১১ টা। সে অবাক হয়। ভাবে মেজবৌদি যদি এই সময় যদি রসের গল্প করতে আসে তাহলে সে দুকথা শুনিয়ে দেবে। এসব সাত পাঁচ ভেবে দরজা খুলতেই চমকে উঠল ও।

একি সামনে কে দাঁড়িয়ে? সিদ্ধার্থ না? একি চেহারা হয়েছে? একমুখ দাড়ি। মাথার চুল রুক্ষ হয়ে গেছে অযত্নে। গায়ের রঙ পুড়ে গেছে পুরো। জামা কাপড় শতচ্ছিন্ন। স্তব্ধ হয়ে গেল প্রজ্ঞার হৃদয়। আচমকা ওকে জড়িয়ে ধরে সিদ্ধার্থ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে। কানে কানে বলে, “কিছু খেতে দিতে পারবে গো? চারদিন ধরে শুধু জল আর মুড়ি খেয়ে আছি।” চোখ ফেটে জল এল প্রজ্ঞার। অতো বড়লোক বাড়ির অতো আদরের ছেলে আজ এতদিন অভুক্ত। বলল, “দাঁড়াও একটু।” সিদ্ধার্থ ওর হাত ধরে বলল, ” শোনো, আস্তে করে যেও। তোমার পাশের বাড়িতে পুলিশের চর এসেছে আজ ৭ দিন।” প্রজ্ঞার বুক হিম হয়ে যায় শুনে। আস্তে আস্তে করে নিচের রান্নাঘরে নেমে মিটসেফ খুলে পায়, রুটি, একটু তরকারি, অল্প ডাল আর দুটো অমৃতি। তাইই নিয়ে ছাদে উঠে আসে সে। গোটা পাড়াটা শীতে নিস্তব্ধ। কেউ জেগে নেই। বুভুক্ষুর মতো সিদ্ধার্থ তাই খেল পশুর মত। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে প্রজ্ঞা বলল, “ধীরে ধীরে খাও।”
সিদ্ধার্থর খাওয়া হলে ঐ থালাতেই আঁচিয়ে দিল। হঠাৎ বাইরের রাস্তায় কারুর পায়ের আওয়াজ মনে হতেই প্রজ্ঞা চট করে আলো নিবিয়ে দিল। হারিকেনের শিখাটা খুব কমিয়ে দিয়ে সিদ্ধার্থের মুখটা নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে দিল। স্পষ্ট বুঝতে পারছে সে, সিদ্ধার্থ ভয়ে কাঁপছে। এমনি করে কিছুক্ষন কাটার পর প্রজ্ঞা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। হারিকেনের আলোয় সিদ্ধার্থ দেখতে পেল, এক অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারিণী তার প্রেমিকা। সে রূপ অসম্ভব স্নিগ্ধ, অসম্ভব পবিত্র। তার মনে হল সে যদি তার প্রেমিকাকে ছোঁয়, হয়ত তার পাপ হবে। তাও সে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর। আজ রাতটুকুই তো সম্বল। তারপর যদি দেখা না হয়? প্রাণপণে ওর ঠোঁট থেকে শুষে নিতে থাকল প্রাণশক্তি, “আহ মিতা, তোমাকে কতদিন পাইনি কাছে।” প্রজ্ঞার আঁচল মাটিতে লুটোচ্ছে। সিদ্ধার্থ নগ্ন মুহূর্তকালে। সে বুঝতে পারছে, পিঠে আঁচড় কাটছে প্রেয়সীর নখ। সে আরও কাছে চেপে ধরে তাকে। আরও কাছে টেনে আনে। দুটো শরীরে শঙ্খ লাগে প্রথমবার, নিঃশব্দে।
রমণ শেষে প্রজ্ঞার এলোচুলে আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে সিদ্ধার্থ বলে, “মিতা, সরি।”
প্রজ্ঞাপারমিতা ভেজা গলায় বলে, “এতদিন কোথায় ছিলে তুমি?”
“আমি পার্টির নির্দেশে উত্তরবঙ্গে ছিলাম। বাড়ির সাথে সম্পর্ক নেই আর। আমার ওপর নির্দেশ আছে অনেক কাজের। মিতা কথা দাও অপেক্ষা করবে।”
“না যেও না সিদ্ধার্থ। আমি এখানে একলা। বড্ড একলা।”, প্রজ্ঞার গলায় আকুতি ঝরে পড়ে।
আলতো হেসে সিদ্ধার্থ বলে, “কেঁদো না লক্ষ্মীটি। গৌতম তোমাকে আমার সব খবর দেবে।”
“না তোমাকে চাই শুধু। এ লড়াইয়ে কোনও দিশা নেই। তোমাকে আমি হারাতে পারব না।”
“আমি ঠিক ফিরে আসব। কথা দিলাম। এখন একটু ঘুমাও।”

সেটা ছিল ওদের শেষ দেখা। তারপর সিদ্ধার্থ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। ক্রমশ এপ্রিলের শেষ এগিয়ে আসে। পরীক্ষার চাপ বাড়তে থাকে। সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে ওর অম্বল আর অরুচি। এসবের জন্য ওর মা দায়ি করে রাতজাগা আর পড়ার চিন্তাকে। এসবের মাঝে একদিন ক্লাসে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায়। সাথে উঠে আসে প্রচুর বমি। একটু সুস্থ হলে ইউনিয়নের একটি মেয়ে এসে বলে, “দিদি, আমার লক্ষন ঠিক লাগছে না। তুমি কি কারুর সাথে? মানে তুমি তো বিয়ে করনি। কথাটা খুব লজ্জার কিন্তু।” প্রজ্ঞার সময় লাগে কথাটা বুঝতে। তারপর পিঠ দিয়ে হিমস্রোত বয়ে যায়। একি কথা শুনছে সে? সে হাসবে না কাঁদবে? সে কুমারী মেয়ে আবার পেটে বাসা বেঁধেছে সিদ্ধার্থর সন্তান ! কি করবে সে?

ক্রমশঃ (To be continued)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৪)

১৯৭২ সাল; প্রজ্ঞা সেকেন্ড ইয়ারে, গৌতমের ফাইনাল ইয়ার। সিদ্ধার্থ পাশ করে বেরিয়ে গেছে। ক্রমশ সিদ্ধার্থ অনুপস্থিত হতে থাকে ইউনিয়ন মিটিঙে, চিত্রা সিনেমার শোতে, ভিক্টোরিয়ার লেকে, কফি হাউসে। কমরেড গৌতম বসু তখন সামলায় কলেজ ইউনিয়ন ওর অনুপস্থিতিতে। আর হয়ে ওঠে প্রজ্ঞার বন্ধু, আশ্রয়দাতা। প্রজ্ঞার রাজনীতি করা নিয়ে বাড়িতে অশান্তি হয় প্রায়ই। বাবা মা চায় না গেরস্ত বাড়ির সোমত্ত মেয়ে এভাবে ছুটে বেড়াক। রক্ষে একটাই, প্রবল কংগ্রেসি বাড়ির গৃহকর্তা জানেন না যে কন্যাটি বিপক্ষ দলের সমর্থক। তাও হয়তো মেজ আর সেজ দাদার প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছিল বলে প্রজ্ঞা বাড়তে থাকে। বাড়ির লোক মুখ বুজে মেনে নেয়। কেই বা চায় রোজগেরে ছেলেদের চটাতে! বাংলায় অরাজকতা বাড়তে থাকে। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের দিকে হাওয়া ঘুরছে ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে কার্ফু ঘোষণা হয়ে যায়। প্রধান বিরোধী নেতা হিসেবে জ্যোতি বসু ভীষণ জনপ্রিয় যুবসমাজে। শহরতলির দিকে নক্সালদের আতঙ্ক প্রবল। এই সময়ে শ্লোগান উঠল, ‘পুলিশ তুমি যতই মারো। মাইনে তোমার একশো বারো।’ কলেজে খবর আসতে থাকে রোজ কেউ না কেউ গ্রেফতার হচ্ছে। ধীরে ধীরে সুবীর, সুনিপ, প্রমীলা, গীতা, অতিন, শম্পা; মেধাবী ছেলেমেয়ে গুলো নক্সাল হয়ে যায়। তারপর একদিন গ্রেফতার হয়ে যায় মাঝরাতে। তারপর? তারপর গড়ের মাঠে দৌড়াতে দৌড়াতে ওরা পৃথিবী থেকে মুছে যায়।

তাও এই ঝড়ের মাঝে সিদ্ধার্থ আর প্রজ্ঞা নিভৃত খুঁজে নেয় সিদ্ধার্থর স্টাডি রুমে। বৃষ্টির দিনে দুটো শরীর উষ্ণতা খুঁজে নেয় একে অপরের সান্নিধ্যে। চুমুতে চুমুতে হারিয়ে যায় ওরা। এমনি একদিন মাতাল করা দিনে দুজনে এলোমেলো বিছানায় শুয়ে ছিল। প্রজ্ঞার নগ্ন পিঠে সিদ্ধার্থ আঙ্গুল বোলাচ্ছিল।
প্রজ্ঞা জিজ্ঞেস করল, “কি আঁকছ অমনি করে আঙ্গুল বুলিয়ে?”
চোখের কোণে হাসি ফুটিয়ে সিদ্ধার্থ বলল, “তোমাকে।”
ক্ষণিক নিস্তব্ধ থাকার পর প্রজ্ঞা আবার বলে উঠল, “সিদ্ধার্থ।”
অস্ফুটে সিদ্ধার্থ বলল, “উঁ?”
“তুমি আমায় ভালবাস?”, প্রজ্ঞার গলায় সঙ্কোচ।
“নাঃ। একদমই না।”, সিদ্ধার্থ দুষ্টুমি করে প্রজ্ঞার নাক টিপে দেয়।
“আঃ, সিরিয়াসলি বলো না।”, প্রজ্ঞার গলায় চাপা বিরক্তি।
মুহূর্তে প্রজ্ঞার পাখির মতো হাল্কা শরীরটা নিজের ওপর তুলে নিয়ে সিদ্ধার্থ বলে, “বাসি। ভীষণ।”
“তাহলে তুমি কোথায় উধাও হয়ে যাও আমাকে না বলে?”, প্রজ্ঞার গলায় অনুযোগের সুর।
প্রজ্ঞার ছুল গুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিয়ে সিদ্ধার্থ বলে, “যাই, এক জায়গায়। বলা যাবে না। মন্ত্রগুপ্তি।”
“সিদ্ধার্থ!”। ডুকরে ওঠে প্রজ্ঞা।
“এই বোকা একদম কাঁদে না। না।” সিদ্ধার্থ কামড়ে ধরে প্রজ্ঞার তোলার ঠোঁট, “মিতা। তুমি শুধুই আমার। তোমাকে ছেড়ে আমি কোথায় যাবো?”
“হুহঃ তোমার জীবনে আবার মেয়ের অভাব?!”, সদ্য কৈশোর পেরোনো প্রজ্ঞার গলায় অভিমান টের পায় সিদ্ধার্থ। প্রেয়সীর মনে প্রলেপ দিতে বলে ওঠে, ” তা বলতে পার। তবে তারা কেউ আমাকে ডিবেটে হারায়নি। আমার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উদ্বাস্তু কলোনির কাজে সাহায্য করেনি।”
প্রজ্ঞা আঁকড়ে ধরে প্রেমিকে, “আমার বড়ো ভয় করে গো।”
“কিসের?”, স্নেহাচ্ছন্ন গলায় বলে সিদ্ধার্থ।
ভীরু হরিণীর মতো চোখে প্রজ্ঞা বলে, “আমাদের ভালোবাসা ফসিল হয়ে যাবে।”
“ধুর পাগল।”, অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে সিদ্ধার্থ, “একবার এই বুর্জোয়া সরকারটা উলটে যাক। আমাদের সন্তানকে নতুন পৃথিবী দেখাব আমি।”
“সত্যি?”, প্রজ্ঞার চোখে খুশি উপচে পড়ে।
“হ্যাঁ গো। আমি ঠিক করেছি, ছেলে হলে নাম দেব দেবাদৃত আর মেয়ে হলে নাম দেব সঙ্ঘমিত্রা। এবার তোমার কাকে চাই?, সেই দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকায় সে প্রজ্ঞার দিকে।
“ধ্যাত! অসভ্য।” এই বলে সিদ্ধার্থর ঠোঁটদুটো চেপে ধরে সে। আবেগে ভেসে যায় দুজন।

ঘড়িতে প্রায় সাড়ে ৯টা বাজে। মেইর দেরি হওয়াতে বিরক্ত হচ্ছেন প্রজ্ঞাদেবী। ডিনারটাইম পার করে খাওয়াটা তার পছন্দ কোনোকালে না। মঠটাও আস্তে আস্তে খালি হচ্ছে। আইপডটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ান।হঠাৎ কানে আসে তাঁর, “মিতা তুমি?”
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই ভূত দেখার মত চমকে ওঠেন তিনি। ভুতই তো! নিজের হাতে কবর দেওয়া পুরনো জীবন যদি আবার বর্তমানে হানা দেয়, তো সেটা ভূত না? স্পষ্ট দেখলেন, মেইডেন হেয়ার গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সিদ্ধার্থ। সেই সুপুরুষ চেহারা। বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে ঠিকই। মধ্যপ্রদেশ ঈষৎ স্ফীত। চুল আর দাড়িতে পাক ধরেছে। কিন্তু চোখদুটো আগের মতই ঝকঝকে। হাতে একটা ক্যামেরা ধরা তাঁর।
“সিদ্ধার্থ!”, অস্ফুটে মুখ দিয়ে বেরল তাঁর। ৩২ বছর পর আবার মুখোমুখি দুজনে।
অবাক চোখে সিদ্ধার্থবাবু দেখতে থাকেন তাঁর একদা প্রেয়সীকে। সোনাঝরা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সাদা তাঁতের শাড়ি পড়ে। গায়ে একটা শাল জড়ানো। সিঁথির দুদিকের চুলে পাক ধরেছে। চামড়া কুঁচকে গেছে কিছুটা। শুধু শুন্য সিঁথিটা বুকে ধাক্কা মারল ঠিকই আবার কৌতূহলও জাগাল অনেক।
কয়েকমুহূর্ত যেন সময় থমকে ছিল। তারপর প্রজ্ঞাদেবীর ভেতর থেকে যেন একটা বিস্ফোরণ বেরিয়ে আস্তে চাইল। বেরিয়ে আস্তে ছাইল অনেকদিনের জমানো রাগ, দুঃখ, হতাশা।উহ! কি স্পর্ধা লোকটার! সাহস হল কি করে ‘মিতা’ বলে ডাকতে? কিন্তু তিনি উত্তর দেওয়ার আগেই মেই চলে এল।
“মাফ করবেন ম্যাম। একটু দেরি হয়ে গেল। চলুন এখন, কাল আবার আসব।”, মেই এসে ওনার হাত ধরে নিয়ে চলে গেল ওদের বাড়ি।

ক্রমশঃ (To be continued)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৩)

আজ বেশ শীত করছে। গু গুইয়িনের বৌদ্ধ মঠটা অপূর্ব সুন্দর। সকালে মেই পৌঁছে দিয়ে গেছে। আবার সেই ডিনারের আগে আনতে আসবে। ওর বাড়ি থেকে ১ ঘণ্টা মতো লাগে। প্রজ্ঞাদেবী গায়ে কাশ্মীরি শালটা টেনে বসলেন মেইডেন হেয়ারের নিচে। শরতের বিদায়বেলা। তাই টুপ টুপ করে পাতাগুলো খসে যাচ্ছে পাতাগুলো। একটা নিশ্বাস ফেলে প্রজ্ঞাদেবী হেলান দিলেন। কানে রাতুলের দেওয়া আইপডে গান বাজছে; হেমন্ত মুখার্জীর গলায়, ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙ্গল ঝড়ে’। আবেশে চোখ বুঝলেন তিনি।

ঝড়? হ্যাঁ, ঝড়ই ছিল সময়টা। আর সেই ঝড়েই হারিয়ে যেতে বসেছিল মিতা। তখন প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র ঐ নামেই বেশি পরিচিত ছিল। টালিগঞ্জের এক ভদ্রস্থ গৃহস্থ মধ্যবিত্তের বাড়ির মেয়ে মিতা প্রেসিডেন্সিতে আসে ইতিহাস নিয়ে পড়তে। চার দাদার পরের একমাত্র বোন মিতা। দুদিকে কলাবেনি ঝুলিয়ে একটা সাদামাটা তাঁতের শাড়ি পরে কলেজ যেত। ওর ঐ মিষ্টি মুখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমাটা বড্ড বেমানান ছিল। হাতে থাকতো দুগাছি সরু সোনার চুড়ি। তার এই বিদ্যেচর্চা পাড়ার অনেকের দ্বিপ্রাহরিক গল্পচর্চার কেন্দ্র ছিল।
সময়টা ১৯৭১ সাল।
সময়টা বড্ড অস্থির ছিল।
নক্সালবাড়ি আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে প্রায়। পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দলনেতা হিসেবে জ্যোতি বসুর উত্থান হচ্ছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ইন্দিরা গান্ধীর কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকৃতি দিয়েছে। থেকে থেকে কলকাতায় ব্ল্যাকআউট হচ্ছে। আকাশে যুদ্ধবিমান উড়ে যাচ্ছে ঘন ঘন। কোলকাতাবাসীরা ভয়ে কাঁপত, ‘এই বুঝি বোম পড়ল’।

এই ঝোড়ো সময়ে মিতার প্রবেশ হল প্রেসিডেন্সীতে। আর সেখানে তার জীবনে প্রবেশ হল সিদ্ধার্থ সেনের। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে ফাইনাল ইয়ার সিনিয়র। ৫’১০’ উচ্চতা, গৌরবর্ণ, অসাধারণ সুপুরুষ ছেলেটি যখন সেতার হাতে উদাত্ত কণ্ঠে ভৈরবী রাগ ধরত, চারপাশ স্তব্ধ হয়ে যেত। কলেজের ডিবেট চ্যাম্পিয়ন ছিল সে। কানাঘুষোতে শোনা যেত, মানু রায়ের সাথে মাঝে মাঝেই চিয়ার্স বলে ওঠেন ওর বাবা। ছেলের নামও নাকি বন্ধুর সাথে মিলিয়ে রাখা। তবে,কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার সুধাংশু সেনের ছেলের পরিচয়ের খোলস কবেই ঝেড়ে ফেলেছিল সে। তা, এহেন অসাধারণ একটি ছেলে, অতিসাধারণ মিতার কাছে কি করে ডিবেটে হেরে যায়, সেটা রহস্য; হয়তো মহাকালের রহস্য। সেবার ১৯৭১ সালে প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র, তর্কযুদ্ধে সিদ্ধার্থ রায়কে হারিয়ে, একটা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। আর সেটাই ছিল ঝড়ের সূত্রপাত। সিদ্ধার্থ মুগ্ধ হয়েছিল মিতার বাগ্মিতায়। ওর শিরায় শিরায় মিতা জড়িয়ে পড়ে। অভিনন্দন দিয়ে যে বন্ধুত্বের সূচনা করেছিল, একদিন এক বিকেলের পড়ন্ত বেলায় মিতার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে তার পরিণতি দেয় সিদ্ধার্থ। ধীরে ধীরে সিদ্ধার্থ মিতার অন্তর্মুখীতার খোলস ভাঙ্গে। প্রত্যক্ষ ছাত্ররাজনীতিতে মিতা জড়িয়ে পড়ে ওর সাথে। ইতিহাসের ক্লাস ফিকে পড়ে যায় রাজনীতির সামনে। ক্রমশ, ও মিতা থেকে, কমরেড প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র হয়ে ওঠে। এক অসাধারণ বাগ্মী, মেধাবী মেয়ে।

মিতা প্রায়ই জিজ্ঞেস করত, “আচ্ছা তোমার বাবা জানতে পারলে কি হবে?”
গাড় আলিঙ্গনে ওকে ধরে কৌতুক চোখে সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করত, “কোনটা?”
“এই যে তুমি মার্ক্সকে পূজ্যপাদ ভাব?”
“ফুঃ, কি হবে? বাড়ি থেকে বের করে দেবে। সেতো মুক্তি আমার। তুমি আমি দুজনে মিলে তখন জ্যোতিবাবুর জন্য মিছিল বার করব।”
“ধ্যাত, পাগল!” এই বলে মিতা সিদ্ধার্থর বুকে কিল মারত।

ঝড় বারতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। যোধপুর পার্কের রেডিওস্টেশন থেকে শিল্পীদের গানের সম্প্রচার চলে। দক্ষিণ কলকাতা তখন অভিজাতদের প্রাণকেন্দ্র। আস্তে আস্তে অনুপ্রবেশকারীরা দখল করতে থাকে কোলকাতার ফুটপাথ। উলঙ্গ, কঙ্কালসার মানুষগুলো, প্রাণের দায়ে পালিয়ে আসা অসহায় প্রাণগুলো, একমুঠো ফ্যানভাতের জন্য গলা চিরে ফেলে। বাংলাতে মুখ্যমন্ত্রীর আসন খালি। রাষ্ট্রপতি শাসনের মাঝে কফিহউস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কানু স্যান্যাল নিয়ে। কফির পেয়ালাতে ঝড় তোলে বিটলসের গান, বম্বের ফিল্ম, উত্তম-সুচিত্রার রসায়ন। শুধু সময় থেমে যেত যখন মিতা গাড়ির ভেতর সিদ্ধার্থর বুকে মাথা দিয়ে চুপ করে ওর হৃৎস্পন্দন শুনত। আর তারপর চুম্বনের আবেশে ওরা ভুলে যেত আরেকটা প্রকাণ্ড ঝড় আসছে, ওলট পালট করা ঝড়।

“আচ্ছা, আপনি কি প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র?” নার্ভাস গলায় একটা প্রশ্নে মিতা পেছনে ঘরে। এই একটু আগে ইউনিয়ন মিটিং শেষ হয়েছে। পরের দিন রিফিউজি কলোনিতে খাবার বিলি করতে যাবে ওরা। তারই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি করছিল মিতা। মাথায় অনেক কাজের চাপ। এর মাঝে নিতান্ত সাধারণ, ধুতি পাঞ্জাবি পরা চশমাপরা একটি ছেলের বেমক্কা ডাকে বিরক্ত হল মিতা।
“নমস্কার। আমি প্রজ্ঞাপারমিতা।”
“নমস্কার। আমি গৌতম বসু। আমি জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্টে পড়ি। সেকেন্ড ইয়ার। আমি সিদ্ধার্থের বন্ধু।”
একটু বিস্ময় নিয়ে মিতা বলে ওঠে, “ও। বলুন? ও ঠিক আছে তো?”
আলতো হেসে ছেলেটি বলে ওঠে, “না। না। ভয়ের কিছু নেই। আসলে একটা বিশেষ দরকারে ও বর্ধমান গেছে। কাল কলোনির কাজে ও উপস্থিত থাকতে পারবে না।”
“সিদ্ধার্থ আসবে না মানে? কৈ? আমায় তো কিছু বলেনি।”, মিতার গলায় একসাথে বিরক্তি আর অসহায়তা ফুটে ওঠে।
তড়িঘড়ি করে গৌতম বলে ওঠে, “আসলে কাল রাতে ওর দিদার মৃত্যু হয়েছে। ও তাই গেছে বর্ধমানে। শ্রাদ্ধ শেষে ফিরে আসবে।”
মিতার হঠাৎ রাগ হয়ে গেল। তলার ঠোঁটটা দাঁতে চেপে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না সে তাও। গলার কাছে একটা কষ্ট দলা পাকাচ্ছিল।
ওর চোখ দেখে গৌতম বলল, “দেখুন, প্রজ্ঞা, আপনাকে আজ বাড়ি অব্দি এগিয়ে দিয়ি। আজ সন্ধ্যে হয়ে এল প্রায়।”
দৃঢ় গলায় মিতা বলে উঠল, “ধন্যবাদ। আমি নিজে চলে যাবো।”

ঝিরি ঝিরি করে পাতা গুলো খসে পড়ছে প্রজ্ঞাদেবীর কোলের ওপর। শরতের ঠাণ্ডা হাওয়া থেকে বাঁচতে শালটা আরও টেনে বসলেন। এখনও হাসি পায় স্বর্গত স্বামীর সাথে প্রথম আলাপটা মনে পড়লে। যদি গৌতম বেঁচে থাকতো, তাহলে তাকে জড়িয়ে ধরে বলত, “পারুল, কাছে এস আরও। ঠাণ্ডা লেগে যাবে।” এমনি সময়ে একটা পাতা ওনার কোলে পড়ল। সত্যি যেন সোনার পাতা। প্রজ্ঞাদেবী একটু চঞ্চল হয়ে উঠলেন। রাত বাড়ছে। মেই তো এখনও এল না ওনাকে আনতে। বলেছিল আজ জিন্সেং স্যুপ করে দেবে।
গানের ট্র্যাক বদলে যায় ক্রমশ। এবার হেমন্তর গলায় বাজছে, “দুরন্ত ঘূর্ণি।”

ক্রমশঃ (To be Continued)