Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৩)

আজ বেশ শীত করছে। গু গুইয়িনের বৌদ্ধ মঠটা অপূর্ব সুন্দর। সকালে মেই পৌঁছে দিয়ে গেছে। আবার সেই ডিনারের আগে আনতে আসবে। ওর বাড়ি থেকে ১ ঘণ্টা মতো লাগে। প্রজ্ঞাদেবী গায়ে কাশ্মীরি শালটা টেনে বসলেন মেইডেন হেয়ারের নিচে। শরতের বিদায়বেলা। তাই টুপ টুপ করে পাতাগুলো খসে যাচ্ছে পাতাগুলো। একটা নিশ্বাস ফেলে প্রজ্ঞাদেবী হেলান দিলেন। কানে রাতুলের দেওয়া আইপডে গান বাজছে; হেমন্ত মুখার্জীর গলায়, ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙ্গল ঝড়ে’। আবেশে চোখ বুঝলেন তিনি।

ঝড়? হ্যাঁ, ঝড়ই ছিল সময়টা। আর সেই ঝড়েই হারিয়ে যেতে বসেছিল মিতা। তখন প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র ঐ নামেই বেশি পরিচিত ছিল। টালিগঞ্জের এক ভদ্রস্থ গৃহস্থ মধ্যবিত্তের বাড়ির মেয়ে মিতা প্রেসিডেন্সিতে আসে ইতিহাস নিয়ে পড়তে। চার দাদার পরের একমাত্র বোন মিতা। দুদিকে কলাবেনি ঝুলিয়ে একটা সাদামাটা তাঁতের শাড়ি পরে কলেজ যেত। ওর ঐ মিষ্টি মুখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমাটা বড্ড বেমানান ছিল। হাতে থাকতো দুগাছি সরু সোনার চুড়ি। তার এই বিদ্যেচর্চা পাড়ার অনেকের দ্বিপ্রাহরিক গল্পচর্চার কেন্দ্র ছিল।
সময়টা ১৯৭১ সাল।
সময়টা বড্ড অস্থির ছিল।
নক্সালবাড়ি আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে প্রায়। পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দলনেতা হিসেবে জ্যোতি বসুর উত্থান হচ্ছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ইন্দিরা গান্ধীর কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকৃতি দিয়েছে। থেকে থেকে কলকাতায় ব্ল্যাকআউট হচ্ছে। আকাশে যুদ্ধবিমান উড়ে যাচ্ছে ঘন ঘন। কোলকাতাবাসীরা ভয়ে কাঁপত, ‘এই বুঝি বোম পড়ল’।

এই ঝোড়ো সময়ে মিতার প্রবেশ হল প্রেসিডেন্সীতে। আর সেখানে তার জীবনে প্রবেশ হল সিদ্ধার্থ সেনের। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে ফাইনাল ইয়ার সিনিয়র। ৫’১০’ উচ্চতা, গৌরবর্ণ, অসাধারণ সুপুরুষ ছেলেটি যখন সেতার হাতে উদাত্ত কণ্ঠে ভৈরবী রাগ ধরত, চারপাশ স্তব্ধ হয়ে যেত। কলেজের ডিবেট চ্যাম্পিয়ন ছিল সে। কানাঘুষোতে শোনা যেত, মানু রায়ের সাথে মাঝে মাঝেই চিয়ার্স বলে ওঠেন ওর বাবা। ছেলের নামও নাকি বন্ধুর সাথে মিলিয়ে রাখা। তবে,কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার সুধাংশু সেনের ছেলের পরিচয়ের খোলস কবেই ঝেড়ে ফেলেছিল সে। তা, এহেন অসাধারণ একটি ছেলে, অতিসাধারণ মিতার কাছে কি করে ডিবেটে হেরে যায়, সেটা রহস্য; হয়তো মহাকালের রহস্য। সেবার ১৯৭১ সালে প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র, তর্কযুদ্ধে সিদ্ধার্থ রায়কে হারিয়ে, একটা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। আর সেটাই ছিল ঝড়ের সূত্রপাত। সিদ্ধার্থ মুগ্ধ হয়েছিল মিতার বাগ্মিতায়। ওর শিরায় শিরায় মিতা জড়িয়ে পড়ে। অভিনন্দন দিয়ে যে বন্ধুত্বের সূচনা করেছিল, একদিন এক বিকেলের পড়ন্ত বেলায় মিতার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে তার পরিণতি দেয় সিদ্ধার্থ। ধীরে ধীরে সিদ্ধার্থ মিতার অন্তর্মুখীতার খোলস ভাঙ্গে। প্রত্যক্ষ ছাত্ররাজনীতিতে মিতা জড়িয়ে পড়ে ওর সাথে। ইতিহাসের ক্লাস ফিকে পড়ে যায় রাজনীতির সামনে। ক্রমশ, ও মিতা থেকে, কমরেড প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র হয়ে ওঠে। এক অসাধারণ বাগ্মী, মেধাবী মেয়ে।

মিতা প্রায়ই জিজ্ঞেস করত, “আচ্ছা তোমার বাবা জানতে পারলে কি হবে?”
গাড় আলিঙ্গনে ওকে ধরে কৌতুক চোখে সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করত, “কোনটা?”
“এই যে তুমি মার্ক্সকে পূজ্যপাদ ভাব?”
“ফুঃ, কি হবে? বাড়ি থেকে বের করে দেবে। সেতো মুক্তি আমার। তুমি আমি দুজনে মিলে তখন জ্যোতিবাবুর জন্য মিছিল বার করব।”
“ধ্যাত, পাগল!” এই বলে মিতা সিদ্ধার্থর বুকে কিল মারত।

ঝড় বারতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। যোধপুর পার্কের রেডিওস্টেশন থেকে শিল্পীদের গানের সম্প্রচার চলে। দক্ষিণ কলকাতা তখন অভিজাতদের প্রাণকেন্দ্র। আস্তে আস্তে অনুপ্রবেশকারীরা দখল করতে থাকে কোলকাতার ফুটপাথ। উলঙ্গ, কঙ্কালসার মানুষগুলো, প্রাণের দায়ে পালিয়ে আসা অসহায় প্রাণগুলো, একমুঠো ফ্যানভাতের জন্য গলা চিরে ফেলে। বাংলাতে মুখ্যমন্ত্রীর আসন খালি। রাষ্ট্রপতি শাসনের মাঝে কফিহউস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কানু স্যান্যাল নিয়ে। কফির পেয়ালাতে ঝড় তোলে বিটলসের গান, বম্বের ফিল্ম, উত্তম-সুচিত্রার রসায়ন। শুধু সময় থেমে যেত যখন মিতা গাড়ির ভেতর সিদ্ধার্থর বুকে মাথা দিয়ে চুপ করে ওর হৃৎস্পন্দন শুনত। আর তারপর চুম্বনের আবেশে ওরা ভুলে যেত আরেকটা প্রকাণ্ড ঝড় আসছে, ওলট পালট করা ঝড়।

“আচ্ছা, আপনি কি প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র?” নার্ভাস গলায় একটা প্রশ্নে মিতা পেছনে ঘরে। এই একটু আগে ইউনিয়ন মিটিং শেষ হয়েছে। পরের দিন রিফিউজি কলোনিতে খাবার বিলি করতে যাবে ওরা। তারই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি করছিল মিতা। মাথায় অনেক কাজের চাপ। এর মাঝে নিতান্ত সাধারণ, ধুতি পাঞ্জাবি পরা চশমাপরা একটি ছেলের বেমক্কা ডাকে বিরক্ত হল মিতা।
“নমস্কার। আমি প্রজ্ঞাপারমিতা।”
“নমস্কার। আমি গৌতম বসু। আমি জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্টে পড়ি। সেকেন্ড ইয়ার। আমি সিদ্ধার্থের বন্ধু।”
একটু বিস্ময় নিয়ে মিতা বলে ওঠে, “ও। বলুন? ও ঠিক আছে তো?”
আলতো হেসে ছেলেটি বলে ওঠে, “না। না। ভয়ের কিছু নেই। আসলে একটা বিশেষ দরকারে ও বর্ধমান গেছে। কাল কলোনির কাজে ও উপস্থিত থাকতে পারবে না।”
“সিদ্ধার্থ আসবে না মানে? কৈ? আমায় তো কিছু বলেনি।”, মিতার গলায় একসাথে বিরক্তি আর অসহায়তা ফুটে ওঠে।
তড়িঘড়ি করে গৌতম বলে ওঠে, “আসলে কাল রাতে ওর দিদার মৃত্যু হয়েছে। ও তাই গেছে বর্ধমানে। শ্রাদ্ধ শেষে ফিরে আসবে।”
মিতার হঠাৎ রাগ হয়ে গেল। তলার ঠোঁটটা দাঁতে চেপে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না সে তাও। গলার কাছে একটা কষ্ট দলা পাকাচ্ছিল।
ওর চোখ দেখে গৌতম বলল, “দেখুন, প্রজ্ঞা, আপনাকে আজ বাড়ি অব্দি এগিয়ে দিয়ি। আজ সন্ধ্যে হয়ে এল প্রায়।”
দৃঢ় গলায় মিতা বলে উঠল, “ধন্যবাদ। আমি নিজে চলে যাবো।”

ঝিরি ঝিরি করে পাতা গুলো খসে পড়ছে প্রজ্ঞাদেবীর কোলের ওপর। শরতের ঠাণ্ডা হাওয়া থেকে বাঁচতে শালটা আরও টেনে বসলেন। এখনও হাসি পায় স্বর্গত স্বামীর সাথে প্রথম আলাপটা মনে পড়লে। যদি গৌতম বেঁচে থাকতো, তাহলে তাকে জড়িয়ে ধরে বলত, “পারুল, কাছে এস আরও। ঠাণ্ডা লেগে যাবে।” এমনি সময়ে একটা পাতা ওনার কোলে পড়ল। সত্যি যেন সোনার পাতা। প্রজ্ঞাদেবী একটু চঞ্চল হয়ে উঠলেন। রাত বাড়ছে। মেই তো এখনও এল না ওনাকে আনতে। বলেছিল আজ জিন্সেং স্যুপ করে দেবে।
গানের ট্র্যাক বদলে যায় ক্রমশ। এবার হেমন্তর গলায় বাজছে, “দুরন্ত ঘূর্ণি।”

ক্রমশঃ (To be Continued)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ২)

সঙ্ঘমিত্রা তার মায়ের বেরানোর প্ল্যানটা ভালোই বানিয়েছিল। তবে অক্টোবরে কোলকাতার দুর্গাপুজো ছেড়ে কে যেতে চায়? তায় সময়টা ২০১০ সাল। তখনতো স্মার্টফোন সবে ঢুকেছে বাঙ্গালীর ঘরে। বিএসএনএল, এয়ারটেল ছাড়া তেমন কোনও ভালো সার্ভিস প্রোভাইডার নেই। ৪ জি ইন্টারনেট দূরঅস্ত ব্যাপার। জয় এসে প্ল্যান বোঝাল, “দেখুন মা, বেইজিংএ থাকবেন ৭ দিন। ওখানে আমার পুরনো বন্ধু থাকবে। ওর নাম দীপ্ত। ও আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দেবে আর ওইই গাইড এনে দেবে আর আপনার সাথে থাকবে।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “বাবা, ফরবিডেন সিটি ঘুরতেই তো ২ দিন লেগে যাবে।”
জয় বলল, “লাগুক না। তার পরের দিন, টেম্পল অফ হেভেন, জিংশান পার্ক, প্যালেস মিউসিয়াম ঘুরে নেবেন। আর বার্ডস নেস্ট স্টেডিয়ামটা মিস করবেন না”
তড়বড় করে মিত্রা বলে উঠল, “অতো ডিরেকশন দিতে হবে না মাকে। তুমি দীপ্তকে বলে দিও মা ওর কাছেই খেয়ে নেবে।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “ও মা! আমি তো চাইনীজ খাই রে মুনু।”
মিত্রা বলল, “আমরা বঙ্গ-চৈনিক ভার্সান খাই মা। ওথেন্টিক চীনে খাবার নাও খেতে পার তুমি।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “মুনু, আমি একলা যাবো না, ভয় করছে।”
মিত্রা বলল, “ভয় কাটাও মা। তুমি যাচ্ছ, আর হ্যাঁ পারলে আমার জন্য একটা ভালো হেয়ার পিন এনো তো।”
জয় বলল, “দীপ্তর বাড়ি থেকে আপনি কল করে নেবেন আমাদের। ওদের টাইম আড়াই ঘণ্টা এগিয়ে। আপনি ওদের লোকাল টাইম রাত সাড়ে ১০ টাতে ফোন করে নেবেন। চিন্তা করবেন না মা।”

একমাস ধরে এইসব প্ল্যানিং করে, মহালয়ায়ার আগের দিন, সুটকেস গুছিয়ে কোলকাতা বিমানবন্দরে সন্ধ্যেবেলা ওরা পৌঁছাল। মিত্রার ছেলে বাবুই দিদার আঁচল ধরে কতো কথা বকে যাচ্ছে। রাহুল মায়ের নতুন অ্যাডভেঞ্চারের কথায় লাফিয়ে উঠলেও রাতুল বিরক্ত মিত্রার কাণ্ডজ্ঞানহীনতায়। এই নিয়ে মিত্রার সাথে তার বেশ ঝগড়া হয়ে গেছে। বোঝাই যায়, উত্তর কোলকাতার গলি ছেড়ে তুস্কানি উড়ে গেলেও, কিছু লোক তার পূর্বপুরুষের গোঁড়া সংস্কার থেকে বেরতে পারে না। আবার মিত্রাও বুঝতে চায় না, সে ঘোড়ায় জিন দিয়ে থাকে বলে, যে সবাই থাকবে এমন কথা কোথাও লেখা নেই। তারপর, সাড়ে ১৭ ঘণ্টার উড়ান শেষে প্রজ্ঞাদেবী যখন বেইজিং বিমানবন্দরের বাইরে এলেন ,সত্যি বলতে কি; শরীর টানছিল না তাঁর। ভাগ্যক্রমে, দীপ্ত আগে থেকে উপস্থিত ছিল। সে তাঁকে নিয়ে হোটেলে গিয়ে চেক ইন করিয়ে দিল। যাওয়ার সময় বলল, “মাসিমা, ঘুমান। শরীর ঠিক লাগলে, রিসেপশন থেকে আমাকে একটা ফোন করে নেবেন।” বলে একটা প্রণাম করে সে চলে গেল। শুয়ে শুয়ে প্রজ্ঞাদেবী ভাবতে লাগলেন, “গতকাল মহালয়া ছিল। রাহুল রাতুল কি তর্পণ করেছে তাদের বাবার উদ্দেশ্যে? বেঁচে থাকতে মানুষটা খেতে কতো ভালবাসত। চা, বেলের পানা, ঘোল, লস্যি, ফলের রস, জলজিরা- মোদ্দা কথা, তেষ্টা নিবৃত্তির কোনও জিনিস বাদ রাখেননি। আর আজ প্রেতলোকে কি তিনি উপোসী, তৃষ্ণার্ত?”

পরের দিন প্ল্যানমতো দীপ্ত এল আর তার সাথে এল একটি মেয়ে। দীপ্ত বলল, “মাসিমা, এই হল লু মেইহুয়া। আমরা বলি মেই। আমার সাথে ও মিউসিয়ামে কাজ করে। ও আমাদের বেইজিংটা ঘোরাবে।” সাতসকালে এমন এক অনাহুতকে দেখে প্রজ্ঞাদেবী ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “বাবা দীপ্ত, আবার অন্য মানুষ কেন? আমরা দুজনেই তো ঠিক ছিলাম।” দীপ্ত হেসে বলল, “চিন্তা করবেন না। মেই প্যালেস মিউসিয়ামের রেজিস্টার্ড গাইড। ও ভালো ইংলিশ বলে।” মেই হেসে এগিয়ে এসে বলল, ” আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম। অনেক গল্প আমি জানি, বইয়ের পাতার বাইরের। আপনার মজা লাগবে।” পরবর্তী ৭ দিন মেই ভালোই ঘোরাল। সে নিজেও চিং সাম্রাজ্য নিয়ে পড়াশুনো করেছে। ফরবিডেন সিটির এত গল্প জানে, যে সব বলতে গেলে আর একটা ভ্রমণকাহিনী হয়ে যাবে। মেই যখন জানল প্রজ্ঞাদেবী ইতিহাসের গবেষক এবং শানক্সির মেইডেন হেয়ার গাছ দেখতে এসেছেন, সে তো খুশি হয়ে বলেই দিল, ” চানগান থেকে কাছে পড়বে গাছ টা। ওখানেই আমাদের বাড়ি। আপনি আমাদের গেস্ট। আমি মাকে বলে দেব।” প্রজ্ঞাদেবীর কোনও ওজর আপত্তি চলল না। অতঃপর অষ্টমীর দিন ওনারা শানক্সির চানগানের দিকে চললেন। দীপ্ত রয়ে গেল বেইজিঙে। প্রজ্ঞাদেবীর মন পড়ে কলকাতায়। বছর পাঁচেক আগেও এইদিনে কতো হইচই হত। রাহুল, রাতুল, মিত্রা, বউমা, জামাই, নাতি-নাতনি নিয়ে জমজমাট সংসার হত পুজোর কটা দিন।

চানগানের লুয়ানঝেনে মেইর বাড়ি। ওর মা গাও রুও থাকে শুধু বাড়িতে। কাঠের বেশ বড়ো একটা তিনতলা বাড়ি। একতলায় একটা রেস্তরা চালায় রুও। দোতলায় মা মেয়ের থাকার জায়গা। আর তিনতলায় দুটো বড়ো রুম, সামনে খোলা ছাদ সুদ্ধ। প্রতিটি রুমে সুন্দর করে গোছান। রুও বলেই দিল, “আমি ভালো করে রান্না করে দেব। আপনার যা দরকার ইন্টারকমে বলে দেবেন।” ব্যবস্থাটা বেশ সুন্দর। প্রজ্ঞাদেবী বেশ অভিভূত হলেন এরমধারা থাকাতে। মনে পড়ে, গৌতম যখন ঘোরাতে নিয়ে যেত, তুলোয় মুড়ে রাখত তাকে। বাড়ির অন্য বউরা আড়ালে বলত, “আদিখ্যেতা।” আজ যদি লোকটা জানত তার আদরের পারুল এরমভাবে অন্যকারুর ঘরে থাকছে, অনর্থ করে দিত। তাং সাম্রাজ্যের ওপরও বেশ দখল আছে মেয়েটার। শানক্সির ৬ দিন ওনার মনটাকে ভুলিয়ে দিল পুরো। মেই ওনাকে তাংদের ঐতিহাসিক স্থান দেখায়। রুও ওনাকে ডাম্পলিং বানানো শেখায়। তিল তেলে মিষ্টি ভাজে দুজনে। যদিও এই ঘরে হোটেলের বৈভব নেই, তবে আরাম আছে। কলেজে মার্ক্সবাদে এসবই ওদের প্রভাবিত করত না? মেই আর রুও বলেছে একদম পূর্ণিমার দিন মেইডেন হেয়ার গাছ দেখতে যেতে।

প্রজ্ঞাদেবীর এই প্রথম যেন মনে হচ্ছে তিনি ছুটি কাটাচ্ছেন। কোনও তাড়া নেই সাইট সিএংর। কোনও তাড়া নেই বার বার ছবি তোলার। কোনও চিন্তা নেই তিনটে সন্তানকে আগলাবার। হয়তো দশমীতে মায়ের বিসর্জনের সাথে সাথে বসুদের বাড়ির বড়ো বউয়েরও বিসর্জন বোধহয় হয়ে গেছে। মৈত্র বাড়ির ছোট মেয়েটাও বিসর্জিত অনেকদিন। তিনি শুধু প্রজ্ঞাপারমিতা এখন। আজ তো আবার বিকেলে রুও দোকান বন্ধ করে শপিং করাতে নিয়ে গেল। ঝুড়ি ঝুড়ি জিনিষ কিনলেন দুজনে মিলে। আজ ওনার খরচের হিসেব নেওয়ার কেউ নেই। রাতের বেলা ফিরে দেখেন দুজনে দরজার সামনে একজোড়া জুতো। পুরুষমানুষের। অপরাধী মুখ করে মেই জানায় একজন বয়স্ক লোক এসেছেন আমেরিকা থেকে। প্রজ্ঞার পাশের রুমে। রুওকে আশ্বস্ত করে প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আহা, কোনও অসুবিধে নেই। আমি তো আর দুদিন পর দেশে ফিরে যাবো। তোমরা শুধু কাল একটা গাড়ি দেকে দিও মেইডেন হেয়ার যাবার জন্য।” রাতে শোয়ার সময় একটা চাপা অস্বস্তি হল তাঁর। লোকটার উপস্থিতি ঠিক ভালো লাগছে না তাঁর।

ক্রমশঃ (To be continued)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ১)

“পারুল”, কাঁপা কাঁপা গলায় গৌতমবাবু ডাকলেন।
উল বুনতে বুনতে ওনার স্ত্রী উত্তর দিলেন, “উঁ?”
অধৈর্য্য হয়ে আবার বললেন, “ঐ পারুল।”
কাঁটাতে ঘর ফেলতে ফেলতে উত্তর এল, ” বলো গো?”
আদুরে গলায় গৌতমবাবু বললেন, “আমার একটা ইচ্ছে আছে।”
এবার পারমিতাদেবী নড়ে বসলেন। নরম গলায় বললেন, “কি গো?” ছোট্ট করে উত্তর পেলেন, “বিদেশ যাওয়ার।”
একগলা বিস্ময় নিয়ে পারমিতাদেবী বললেন, ” কি যে বলো! এই তো গতবছর তুস্কানি ঘুরে এলে রাতুলের কাছ থেকে।”
আবার ধৈর্য্য হারিয়ে গৌতমবাবু বললেন, “আমি তুস্কানির কথা বলছি না।” পারমিতাদেবী বললেন, “তাহলে? রাহুলের কাছে যাবে বলছ? এই শরীরে সার্ডিংহ্যাম যাওয়ার নামও আনবে না মুখে।”
স্ত্রীর গলায় রাগের পূর্বাভাস পেয়ে অশক্ত হাতে তার গাল ছুঁয়ে বললেন, “আমি আমাদের নিজেদের কথা বলছি গো। ছেলেরা তাদের মত থাক না। আমি তোমার হাতে হাত রেখে সোনার কার্পেটে হাঁটবো; চাঁদের আলোয়।”
হতভম্বের মতো দু মিনিট বসে থেকে পারমিতাদেবী মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠলেন, “মরণ, ঢং দেখো। নাতি নাতনি হয়ে গেছে আমাদের। এসব কি আমদের শোভা পায়? আমার কাজ আছে।”
“পারুল যেয়ো না। বস না আর একটু।” গমনদ্যত স্ত্রীর আঁচল ধরে আকুল গলায় বলে উঠলেন গৌতমবাবু।
নরম গলায় পারমিতাদেবী বলেন, “দাঁড়াও, তোমার ওষুধটা নিয়ে আসি।”
অবুঝ শিশুর মতো গৌতমবাবু বলে ওঠেন, ” সে আনবে’খন। আগে শোনো তো দেখি। বলতো দেখি কোন জায়গায় যাবো বলেছি? পারবে? জানি পারবে না। আমি তোমায় নিয়ে চীনে যাবো।”
“চীনে?” স্তম্ভিত পারমিতাদেবীর মুখে এরপর আর কথা যোগায় না।
“হে হে। কিচ্ছুটি জানো না। শানক্সিতে আছে একটা গাছ। মেইডেন হেয়ার ট্রি। কলেজ থেকে স্বপ্ন ছিল তোমাকে নিয়ে যাবো। তোমার ভালো লাগবে।” শিশুর মতো খিলখিলয়ে হেসে উঠলেন গৌতমবাবু।
স্বামীর বালখিল্যতায় পাল্লা দিতে না পেরে শ্লেষের গলায় বলে উঠলেন, “জানি তো। কলেজে মাও সে তুং তোমার বাবা ছিল।”
“আহা, শোনই না। গাছটা বড়ো অদ্ভুত। ১৪০০ বছর ধরে বেঁচে আছে। শরৎকালে পাতাগুলো সোনার হয়ে যায়। তোমাকে ঐ সোনাঝরা জায়গায় নিয়ে যাবো। লক্ষ্মীটি; রাগ কর না। এই একটি সাধ প্লিজ পূরণ করতে দাও।”

স্ত্রীঅন্ত প্রাণ মানুষটার প্রত্যেকটা শব্দে ঝরে পড়ছিল আকুতি। না, পারমিতাদেবীর কাছে না। নিয়তিদেবীর কাছে। তিনি জানতেন হাতে তাঁর আর বেশী সময় নেই। কেমো আর কাজ করছে না। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষ ঢুকে গেছে। তাও শেষ ইচ্ছে তাঁর পূরণ হয়নি.৩য় স্টেজ ক্যান্সারে ৫৭ বছর বয়সে থেমে গেছিল গৌতমবাবুর জীবনীশক্তি। আর তাঁর আদরের পারুল, যার পোষাকি নাম প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন কাজে। ৩৪ বছরের সঙ্গীর চলে যাওয়ার পর ৪ বছর কেটে গেছে। তুস্কানিতে বড়ো ছেলে রাতুল আর সার্ডিংহ্যামে ছোট ছেলে রাহুল নিজেদের বৃত্তে আবর্তন খায়। শুধু প্রথম সন্তান সঙ্ঘমিত্রা দেশের মাটির টান কাটাতে পারেনি। মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেও অধ্যাপিকা হয়েছে। ব্যাতিক্রম একটাই। সে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপিকা। আসলে, এ বাড়ির কেউই সায়েন্সের ধার ঘেঁষেনি। প্রজ্ঞাপারমিতা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। সৃষ্টিছাড়া সুন্দরী সে। গৌতমের সবচেয়ে আদরের ধন। অথচ মিত্রাকে নিয়ে চাপা অস্বস্তি একটা থেকে গেছে প্রজ্ঞাদেবীর মনে; সারাজীবন।

একদিন, মেয়ে দুম মাকে বলে বসল, “মা, বাবার শেষ ইচ্ছেটা কবে পূরণ করবে?”
একটা জার্নাল চেক করতে করতে ঘাড় তুলে প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “কোনটা?”
চশমাটা নাকের ডগায় তুলে মিত্রা বলল, “ওই সোনাঝরা গাছটার কাছে কবে যাবে?”
“পাগল হলি তুই মুনু?” প্রায় ‌ভৃত্সনার সুরে বলে উঠলেন প্রজ্ঞাদেবী, “আমি চলে গেলে স্টুডেন্টগুলোর কি হবে? বছরের মাঝে ছুটি নেওয়াটা অনৈতিক।”
“মা নিজের জন্য বেঁচেছ কোনোদিন?” মায়ের চোখে চোখ রেখে মিত্রা বলে উঠল, “সারাজীবন তো অন্যের জন্য মরলে।”
কথাটা ধ্বক করে প্রজ্ঞার বুকে লাগলো। একবারই তো বাঁচতে চেয়েছিলেন তিনি। নিজের মতো করে এবং গৌতম না থাকলে কেউ বাঁচাতে পারত তাকে সেই সময়।
“আজে বাজে কথা বোলো না মুনু।”, ধমকে উঠলেন প্রজ্ঞাদেবী।
কিন্তু মিত্রাকে তর্কে হারানো অতো সহজ না। এই গুণটা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া তার। মিত্রা বলে উঠল, “দেখো, কুরুশের কাঁটায় ক্লো‌ক বানানোতে তুমি সেরা। তাতে একটা তোমার একটা নাতি নাতনিকে শীতের জামা কিনতে হয় না। তোমার হাতের বানানো মুরগির রোস্ট পার্কস্ট্রিটকে হার মানায়। বাড়ির লোকের আবদার ফেলতে পার না তাই। মৈত্রম্যামের ক্লাস কেউ মিস করতে চায় না। কিন্তু এসবের মধ্যে প্রজ্ঞাপারমিতা কৈ? দ্যাখো, ভাইরা বিদেশে নিজের মতো বাঁচছে। আমি জয়কে নিয়ে সুখে আছি। আর তুমি? চুপচাপ জানলার ধারে বসে থাকো আর কাঁদো। অনেক হয়েছে আর না। আমি জয়কে বলে তোমার টিকেটের ব্যবস্থা করছি। তোমার এই চায়না ট্রিপটা দরকার।”
“মানে?”, প্রজ্ঞাদেবীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে।
“মানে দিন পনেরর ছুটি নিয়ে ঘুরে এস। আর এক বছর বাকি রিটায়ারমেন্টে তোমার। দাঁড়াও, জয়কে ফোন করি। ও হোটেল বুক করুক।”, মিত্রা ল্যান্ডলাইনে নম্বর ডায়াল করে বলে ওঠে, “হ্যালো, হ্যাঁ, আমি জয়ব্রত সেনের স্ত্রী বলছি।”
অসহায় চোখে দেখতে থাকেন নিজের মেয়ের কর্মতৎপরতা। মেয়ের এই ঝড়ের মতো কাজ করার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটা বার বার অস্বস্তিতে ফেলে তাঁকে। ও যেন বংশছাড়া।
অতঃপর প্রজ্ঞাপারমিতা দেবীর চিনযাত্রা শুরু হল। কোলকাতা থেকে উড়ান শুরু হল। গন্তব্য শানক্সি ; মেইডেন হেয়ার গাছ। তাং সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট তাইজংএর হাতে লাগান গাছ। গৌতমের স্বপ্নের জায়গা।

ক্রমশঃ (To be continued)