Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৪)

১৯৭২ সাল; প্রজ্ঞা সেকেন্ড ইয়ারে, গৌতমের ফাইনাল ইয়ার। সিদ্ধার্থ পাশ করে বেরিয়ে গেছে। ক্রমশ সিদ্ধার্থ অনুপস্থিত হতে থাকে ইউনিয়ন মিটিঙে, চিত্রা সিনেমার শোতে, ভিক্টোরিয়ার লেকে, কফি হাউসে। কমরেড গৌতম বসু তখন সামলায় কলেজ ইউনিয়ন ওর অনুপস্থিতিতে। আর হয়ে ওঠে প্রজ্ঞার বন্ধু, আশ্রয়দাতা। প্রজ্ঞার রাজনীতি করা নিয়ে বাড়িতে অশান্তি হয় প্রায়ই। বাবা মা চায় না গেরস্ত বাড়ির সোমত্ত মেয়ে এভাবে ছুটে বেড়াক। রক্ষে একটাই, প্রবল কংগ্রেসি বাড়ির গৃহকর্তা জানেন না যে কন্যাটি বিপক্ষ দলের সমর্থক। তাও হয়তো মেজ আর সেজ দাদার প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছিল বলে প্রজ্ঞা বাড়তে থাকে। বাড়ির লোক মুখ বুজে মেনে নেয়। কেই বা চায় রোজগেরে ছেলেদের চটাতে! বাংলায় অরাজকতা বাড়তে থাকে। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের দিকে হাওয়া ঘুরছে ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে কার্ফু ঘোষণা হয়ে যায়। প্রধান বিরোধী নেতা হিসেবে জ্যোতি বসু ভীষণ জনপ্রিয় যুবসমাজে। শহরতলির দিকে নক্সালদের আতঙ্ক প্রবল। এই সময়ে শ্লোগান উঠল, ‘পুলিশ তুমি যতই মারো। মাইনে তোমার একশো বারো।’ কলেজে খবর আসতে থাকে রোজ কেউ না কেউ গ্রেফতার হচ্ছে। ধীরে ধীরে সুবীর, সুনিপ, প্রমীলা, গীতা, অতিন, শম্পা; মেধাবী ছেলেমেয়ে গুলো নক্সাল হয়ে যায়। তারপর একদিন গ্রেফতার হয়ে যায় মাঝরাতে। তারপর? তারপর গড়ের মাঠে দৌড়াতে দৌড়াতে ওরা পৃথিবী থেকে মুছে যায়।

তাও এই ঝড়ের মাঝে সিদ্ধার্থ আর প্রজ্ঞা নিভৃত খুঁজে নেয় সিদ্ধার্থর স্টাডি রুমে। বৃষ্টির দিনে দুটো শরীর উষ্ণতা খুঁজে নেয় একে অপরের সান্নিধ্যে। চুমুতে চুমুতে হারিয়ে যায় ওরা। এমনি একদিন মাতাল করা দিনে দুজনে এলোমেলো বিছানায় শুয়ে ছিল। প্রজ্ঞার নগ্ন পিঠে সিদ্ধার্থ আঙ্গুল বোলাচ্ছিল।
প্রজ্ঞা জিজ্ঞেস করল, “কি আঁকছ অমনি করে আঙ্গুল বুলিয়ে?”
চোখের কোণে হাসি ফুটিয়ে সিদ্ধার্থ বলল, “তোমাকে।”
ক্ষণিক নিস্তব্ধ থাকার পর প্রজ্ঞা আবার বলে উঠল, “সিদ্ধার্থ।”
অস্ফুটে সিদ্ধার্থ বলল, “উঁ?”
“তুমি আমায় ভালবাস?”, প্রজ্ঞার গলায় সঙ্কোচ।
“নাঃ। একদমই না।”, সিদ্ধার্থ দুষ্টুমি করে প্রজ্ঞার নাক টিপে দেয়।
“আঃ, সিরিয়াসলি বলো না।”, প্রজ্ঞার গলায় চাপা বিরক্তি।
মুহূর্তে প্রজ্ঞার পাখির মতো হাল্কা শরীরটা নিজের ওপর তুলে নিয়ে সিদ্ধার্থ বলে, “বাসি। ভীষণ।”
“তাহলে তুমি কোথায় উধাও হয়ে যাও আমাকে না বলে?”, প্রজ্ঞার গলায় অনুযোগের সুর।
প্রজ্ঞার ছুল গুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিয়ে সিদ্ধার্থ বলে, “যাই, এক জায়গায়। বলা যাবে না। মন্ত্রগুপ্তি।”
“সিদ্ধার্থ!”। ডুকরে ওঠে প্রজ্ঞা।
“এই বোকা একদম কাঁদে না। না।” সিদ্ধার্থ কামড়ে ধরে প্রজ্ঞার তোলার ঠোঁট, “মিতা। তুমি শুধুই আমার। তোমাকে ছেড়ে আমি কোথায় যাবো?”
“হুহঃ তোমার জীবনে আবার মেয়ের অভাব?!”, সদ্য কৈশোর পেরোনো প্রজ্ঞার গলায় অভিমান টের পায় সিদ্ধার্থ। প্রেয়সীর মনে প্রলেপ দিতে বলে ওঠে, ” তা বলতে পার। তবে তারা কেউ আমাকে ডিবেটে হারায়নি। আমার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উদ্বাস্তু কলোনির কাজে সাহায্য করেনি।”
প্রজ্ঞা আঁকড়ে ধরে প্রেমিকে, “আমার বড়ো ভয় করে গো।”
“কিসের?”, স্নেহাচ্ছন্ন গলায় বলে সিদ্ধার্থ।
ভীরু হরিণীর মতো চোখে প্রজ্ঞা বলে, “আমাদের ভালোবাসা ফসিল হয়ে যাবে।”
“ধুর পাগল।”, অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে সিদ্ধার্থ, “একবার এই বুর্জোয়া সরকারটা উলটে যাক। আমাদের সন্তানকে নতুন পৃথিবী দেখাব আমি।”
“সত্যি?”, প্রজ্ঞার চোখে খুশি উপচে পড়ে।
“হ্যাঁ গো। আমি ঠিক করেছি, ছেলে হলে নাম দেব দেবাদৃত আর মেয়ে হলে নাম দেব সঙ্ঘমিত্রা। এবার তোমার কাকে চাই?, সেই দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকায় সে প্রজ্ঞার দিকে।
“ধ্যাত! অসভ্য।” এই বলে সিদ্ধার্থর ঠোঁটদুটো চেপে ধরে সে। আবেগে ভেসে যায় দুজন।

ঘড়িতে প্রায় সাড়ে ৯টা বাজে। মেইর দেরি হওয়াতে বিরক্ত হচ্ছেন প্রজ্ঞাদেবী। ডিনারটাইম পার করে খাওয়াটা তার পছন্দ কোনোকালে না। মঠটাও আস্তে আস্তে খালি হচ্ছে। আইপডটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ান।হঠাৎ কানে আসে তাঁর, “মিতা তুমি?”
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই ভূত দেখার মত চমকে ওঠেন তিনি। ভুতই তো! নিজের হাতে কবর দেওয়া পুরনো জীবন যদি আবার বর্তমানে হানা দেয়, তো সেটা ভূত না? স্পষ্ট দেখলেন, মেইডেন হেয়ার গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সিদ্ধার্থ। সেই সুপুরুষ চেহারা। বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে ঠিকই। মধ্যপ্রদেশ ঈষৎ স্ফীত। চুল আর দাড়িতে পাক ধরেছে। কিন্তু চোখদুটো আগের মতই ঝকঝকে। হাতে একটা ক্যামেরা ধরা তাঁর।
“সিদ্ধার্থ!”, অস্ফুটে মুখ দিয়ে বেরল তাঁর। ৩২ বছর পর আবার মুখোমুখি দুজনে।
অবাক চোখে সিদ্ধার্থবাবু দেখতে থাকেন তাঁর একদা প্রেয়সীকে। সোনাঝরা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সাদা তাঁতের শাড়ি পড়ে। গায়ে একটা শাল জড়ানো। সিঁথির দুদিকের চুলে পাক ধরেছে। চামড়া কুঁচকে গেছে কিছুটা। শুধু শুন্য সিঁথিটা বুকে ধাক্কা মারল ঠিকই আবার কৌতূহলও জাগাল অনেক।
কয়েকমুহূর্ত যেন সময় থমকে ছিল। তারপর প্রজ্ঞাদেবীর ভেতর থেকে যেন একটা বিস্ফোরণ বেরিয়ে আস্তে চাইল। বেরিয়ে আস্তে ছাইল অনেকদিনের জমানো রাগ, দুঃখ, হতাশা।উহ! কি স্পর্ধা লোকটার! সাহস হল কি করে ‘মিতা’ বলে ডাকতে? কিন্তু তিনি উত্তর দেওয়ার আগেই মেই চলে এল।
“মাফ করবেন ম্যাম। একটু দেরি হয়ে গেল। চলুন এখন, কাল আবার আসব।”, মেই এসে ওনার হাত ধরে নিয়ে চলে গেল ওদের বাড়ি।

ক্রমশঃ (To be continued)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৩)

আজ বেশ শীত করছে। গু গুইয়িনের বৌদ্ধ মঠটা অপূর্ব সুন্দর। সকালে মেই পৌঁছে দিয়ে গেছে। আবার সেই ডিনারের আগে আনতে আসবে। ওর বাড়ি থেকে ১ ঘণ্টা মতো লাগে। প্রজ্ঞাদেবী গায়ে কাশ্মীরি শালটা টেনে বসলেন মেইডেন হেয়ারের নিচে। শরতের বিদায়বেলা। তাই টুপ টুপ করে পাতাগুলো খসে যাচ্ছে পাতাগুলো। একটা নিশ্বাস ফেলে প্রজ্ঞাদেবী হেলান দিলেন। কানে রাতুলের দেওয়া আইপডে গান বাজছে; হেমন্ত মুখার্জীর গলায়, ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙ্গল ঝড়ে’। আবেশে চোখ বুঝলেন তিনি।

ঝড়? হ্যাঁ, ঝড়ই ছিল সময়টা। আর সেই ঝড়েই হারিয়ে যেতে বসেছিল মিতা। তখন প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র ঐ নামেই বেশি পরিচিত ছিল। টালিগঞ্জের এক ভদ্রস্থ গৃহস্থ মধ্যবিত্তের বাড়ির মেয়ে মিতা প্রেসিডেন্সিতে আসে ইতিহাস নিয়ে পড়তে। চার দাদার পরের একমাত্র বোন মিতা। দুদিকে কলাবেনি ঝুলিয়ে একটা সাদামাটা তাঁতের শাড়ি পরে কলেজ যেত। ওর ঐ মিষ্টি মুখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমাটা বড্ড বেমানান ছিল। হাতে থাকতো দুগাছি সরু সোনার চুড়ি। তার এই বিদ্যেচর্চা পাড়ার অনেকের দ্বিপ্রাহরিক গল্পচর্চার কেন্দ্র ছিল।
সময়টা ১৯৭১ সাল।
সময়টা বড্ড অস্থির ছিল।
নক্সালবাড়ি আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে প্রায়। পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দলনেতা হিসেবে জ্যোতি বসুর উত্থান হচ্ছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ইন্দিরা গান্ধীর কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকৃতি দিয়েছে। থেকে থেকে কলকাতায় ব্ল্যাকআউট হচ্ছে। আকাশে যুদ্ধবিমান উড়ে যাচ্ছে ঘন ঘন। কোলকাতাবাসীরা ভয়ে কাঁপত, ‘এই বুঝি বোম পড়ল’।

এই ঝোড়ো সময়ে মিতার প্রবেশ হল প্রেসিডেন্সীতে। আর সেখানে তার জীবনে প্রবেশ হল সিদ্ধার্থ সেনের। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে ফাইনাল ইয়ার সিনিয়র। ৫’১০’ উচ্চতা, গৌরবর্ণ, অসাধারণ সুপুরুষ ছেলেটি যখন সেতার হাতে উদাত্ত কণ্ঠে ভৈরবী রাগ ধরত, চারপাশ স্তব্ধ হয়ে যেত। কলেজের ডিবেট চ্যাম্পিয়ন ছিল সে। কানাঘুষোতে শোনা যেত, মানু রায়ের সাথে মাঝে মাঝেই চিয়ার্স বলে ওঠেন ওর বাবা। ছেলের নামও নাকি বন্ধুর সাথে মিলিয়ে রাখা। তবে,কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার সুধাংশু সেনের ছেলের পরিচয়ের খোলস কবেই ঝেড়ে ফেলেছিল সে। তা, এহেন অসাধারণ একটি ছেলে, অতিসাধারণ মিতার কাছে কি করে ডিবেটে হেরে যায়, সেটা রহস্য; হয়তো মহাকালের রহস্য। সেবার ১৯৭১ সালে প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র, তর্কযুদ্ধে সিদ্ধার্থ রায়কে হারিয়ে, একটা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। আর সেটাই ছিল ঝড়ের সূত্রপাত। সিদ্ধার্থ মুগ্ধ হয়েছিল মিতার বাগ্মিতায়। ওর শিরায় শিরায় মিতা জড়িয়ে পড়ে। অভিনন্দন দিয়ে যে বন্ধুত্বের সূচনা করেছিল, একদিন এক বিকেলের পড়ন্ত বেলায় মিতার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে তার পরিণতি দেয় সিদ্ধার্থ। ধীরে ধীরে সিদ্ধার্থ মিতার অন্তর্মুখীতার খোলস ভাঙ্গে। প্রত্যক্ষ ছাত্ররাজনীতিতে মিতা জড়িয়ে পড়ে ওর সাথে। ইতিহাসের ক্লাস ফিকে পড়ে যায় রাজনীতির সামনে। ক্রমশ, ও মিতা থেকে, কমরেড প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র হয়ে ওঠে। এক অসাধারণ বাগ্মী, মেধাবী মেয়ে।

মিতা প্রায়ই জিজ্ঞেস করত, “আচ্ছা তোমার বাবা জানতে পারলে কি হবে?”
গাড় আলিঙ্গনে ওকে ধরে কৌতুক চোখে সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করত, “কোনটা?”
“এই যে তুমি মার্ক্সকে পূজ্যপাদ ভাব?”
“ফুঃ, কি হবে? বাড়ি থেকে বের করে দেবে। সেতো মুক্তি আমার। তুমি আমি দুজনে মিলে তখন জ্যোতিবাবুর জন্য মিছিল বার করব।”
“ধ্যাত, পাগল!” এই বলে মিতা সিদ্ধার্থর বুকে কিল মারত।

ঝড় বারতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। যোধপুর পার্কের রেডিওস্টেশন থেকে শিল্পীদের গানের সম্প্রচার চলে। দক্ষিণ কলকাতা তখন অভিজাতদের প্রাণকেন্দ্র। আস্তে আস্তে অনুপ্রবেশকারীরা দখল করতে থাকে কোলকাতার ফুটপাথ। উলঙ্গ, কঙ্কালসার মানুষগুলো, প্রাণের দায়ে পালিয়ে আসা অসহায় প্রাণগুলো, একমুঠো ফ্যানভাতের জন্য গলা চিরে ফেলে। বাংলাতে মুখ্যমন্ত্রীর আসন খালি। রাষ্ট্রপতি শাসনের মাঝে কফিহউস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কানু স্যান্যাল নিয়ে। কফির পেয়ালাতে ঝড় তোলে বিটলসের গান, বম্বের ফিল্ম, উত্তম-সুচিত্রার রসায়ন। শুধু সময় থেমে যেত যখন মিতা গাড়ির ভেতর সিদ্ধার্থর বুকে মাথা দিয়ে চুপ করে ওর হৃৎস্পন্দন শুনত। আর তারপর চুম্বনের আবেশে ওরা ভুলে যেত আরেকটা প্রকাণ্ড ঝড় আসছে, ওলট পালট করা ঝড়।

“আচ্ছা, আপনি কি প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র?” নার্ভাস গলায় একটা প্রশ্নে মিতা পেছনে ঘরে। এই একটু আগে ইউনিয়ন মিটিং শেষ হয়েছে। পরের দিন রিফিউজি কলোনিতে খাবার বিলি করতে যাবে ওরা। তারই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি করছিল মিতা। মাথায় অনেক কাজের চাপ। এর মাঝে নিতান্ত সাধারণ, ধুতি পাঞ্জাবি পরা চশমাপরা একটি ছেলের বেমক্কা ডাকে বিরক্ত হল মিতা।
“নমস্কার। আমি প্রজ্ঞাপারমিতা।”
“নমস্কার। আমি গৌতম বসু। আমি জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্টে পড়ি। সেকেন্ড ইয়ার। আমি সিদ্ধার্থের বন্ধু।”
একটু বিস্ময় নিয়ে মিতা বলে ওঠে, “ও। বলুন? ও ঠিক আছে তো?”
আলতো হেসে ছেলেটি বলে ওঠে, “না। না। ভয়ের কিছু নেই। আসলে একটা বিশেষ দরকারে ও বর্ধমান গেছে। কাল কলোনির কাজে ও উপস্থিত থাকতে পারবে না।”
“সিদ্ধার্থ আসবে না মানে? কৈ? আমায় তো কিছু বলেনি।”, মিতার গলায় একসাথে বিরক্তি আর অসহায়তা ফুটে ওঠে।
তড়িঘড়ি করে গৌতম বলে ওঠে, “আসলে কাল রাতে ওর দিদার মৃত্যু হয়েছে। ও তাই গেছে বর্ধমানে। শ্রাদ্ধ শেষে ফিরে আসবে।”
মিতার হঠাৎ রাগ হয়ে গেল। তলার ঠোঁটটা দাঁতে চেপে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না সে তাও। গলার কাছে একটা কষ্ট দলা পাকাচ্ছিল।
ওর চোখ দেখে গৌতম বলল, “দেখুন, প্রজ্ঞা, আপনাকে আজ বাড়ি অব্দি এগিয়ে দিয়ি। আজ সন্ধ্যে হয়ে এল প্রায়।”
দৃঢ় গলায় মিতা বলে উঠল, “ধন্যবাদ। আমি নিজে চলে যাবো।”

ঝিরি ঝিরি করে পাতা গুলো খসে পড়ছে প্রজ্ঞাদেবীর কোলের ওপর। শরতের ঠাণ্ডা হাওয়া থেকে বাঁচতে শালটা আরও টেনে বসলেন। এখনও হাসি পায় স্বর্গত স্বামীর সাথে প্রথম আলাপটা মনে পড়লে। যদি গৌতম বেঁচে থাকতো, তাহলে তাকে জড়িয়ে ধরে বলত, “পারুল, কাছে এস আরও। ঠাণ্ডা লেগে যাবে।” এমনি সময়ে একটা পাতা ওনার কোলে পড়ল। সত্যি যেন সোনার পাতা। প্রজ্ঞাদেবী একটু চঞ্চল হয়ে উঠলেন। রাত বাড়ছে। মেই তো এখনও এল না ওনাকে আনতে। বলেছিল আজ জিন্সেং স্যুপ করে দেবে।
গানের ট্র্যাক বদলে যায় ক্রমশ। এবার হেমন্তর গলায় বাজছে, “দুরন্ত ঘূর্ণি।”

ক্রমশঃ (To be Continued)

Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ২)

সঙ্ঘমিত্রা তার মায়ের বেরানোর প্ল্যানটা ভালোই বানিয়েছিল। তবে অক্টোবরে কোলকাতার দুর্গাপুজো ছেড়ে কে যেতে চায়? তায় সময়টা ২০১০ সাল। তখনতো স্মার্টফোন সবে ঢুকেছে বাঙ্গালীর ঘরে। বিএসএনএল, এয়ারটেল ছাড়া তেমন কোনও ভালো সার্ভিস প্রোভাইডার নেই। ৪ জি ইন্টারনেট দূরঅস্ত ব্যাপার। জয় এসে প্ল্যান বোঝাল, “দেখুন মা, বেইজিংএ থাকবেন ৭ দিন। ওখানে আমার পুরনো বন্ধু থাকবে। ওর নাম দীপ্ত। ও আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দেবে আর ওইই গাইড এনে দেবে আর আপনার সাথে থাকবে।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “বাবা, ফরবিডেন সিটি ঘুরতেই তো ২ দিন লেগে যাবে।”
জয় বলল, “লাগুক না। তার পরের দিন, টেম্পল অফ হেভেন, জিংশান পার্ক, প্যালেস মিউসিয়াম ঘুরে নেবেন। আর বার্ডস নেস্ট স্টেডিয়ামটা মিস করবেন না”
তড়বড় করে মিত্রা বলে উঠল, “অতো ডিরেকশন দিতে হবে না মাকে। তুমি দীপ্তকে বলে দিও মা ওর কাছেই খেয়ে নেবে।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “ও মা! আমি তো চাইনীজ খাই রে মুনু।”
মিত্রা বলল, “আমরা বঙ্গ-চৈনিক ভার্সান খাই মা। ওথেন্টিক চীনে খাবার নাও খেতে পার তুমি।”
প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “মুনু, আমি একলা যাবো না, ভয় করছে।”
মিত্রা বলল, “ভয় কাটাও মা। তুমি যাচ্ছ, আর হ্যাঁ পারলে আমার জন্য একটা ভালো হেয়ার পিন এনো তো।”
জয় বলল, “দীপ্তর বাড়ি থেকে আপনি কল করে নেবেন আমাদের। ওদের টাইম আড়াই ঘণ্টা এগিয়ে। আপনি ওদের লোকাল টাইম রাত সাড়ে ১০ টাতে ফোন করে নেবেন। চিন্তা করবেন না মা।”

একমাস ধরে এইসব প্ল্যানিং করে, মহালয়ায়ার আগের দিন, সুটকেস গুছিয়ে কোলকাতা বিমানবন্দরে সন্ধ্যেবেলা ওরা পৌঁছাল। মিত্রার ছেলে বাবুই দিদার আঁচল ধরে কতো কথা বকে যাচ্ছে। রাহুল মায়ের নতুন অ্যাডভেঞ্চারের কথায় লাফিয়ে উঠলেও রাতুল বিরক্ত মিত্রার কাণ্ডজ্ঞানহীনতায়। এই নিয়ে মিত্রার সাথে তার বেশ ঝগড়া হয়ে গেছে। বোঝাই যায়, উত্তর কোলকাতার গলি ছেড়ে তুস্কানি উড়ে গেলেও, কিছু লোক তার পূর্বপুরুষের গোঁড়া সংস্কার থেকে বেরতে পারে না। আবার মিত্রাও বুঝতে চায় না, সে ঘোড়ায় জিন দিয়ে থাকে বলে, যে সবাই থাকবে এমন কথা কোথাও লেখা নেই। তারপর, সাড়ে ১৭ ঘণ্টার উড়ান শেষে প্রজ্ঞাদেবী যখন বেইজিং বিমানবন্দরের বাইরে এলেন ,সত্যি বলতে কি; শরীর টানছিল না তাঁর। ভাগ্যক্রমে, দীপ্ত আগে থেকে উপস্থিত ছিল। সে তাঁকে নিয়ে হোটেলে গিয়ে চেক ইন করিয়ে দিল। যাওয়ার সময় বলল, “মাসিমা, ঘুমান। শরীর ঠিক লাগলে, রিসেপশন থেকে আমাকে একটা ফোন করে নেবেন।” বলে একটা প্রণাম করে সে চলে গেল। শুয়ে শুয়ে প্রজ্ঞাদেবী ভাবতে লাগলেন, “গতকাল মহালয়া ছিল। রাহুল রাতুল কি তর্পণ করেছে তাদের বাবার উদ্দেশ্যে? বেঁচে থাকতে মানুষটা খেতে কতো ভালবাসত। চা, বেলের পানা, ঘোল, লস্যি, ফলের রস, জলজিরা- মোদ্দা কথা, তেষ্টা নিবৃত্তির কোনও জিনিস বাদ রাখেননি। আর আজ প্রেতলোকে কি তিনি উপোসী, তৃষ্ণার্ত?”

পরের দিন প্ল্যানমতো দীপ্ত এল আর তার সাথে এল একটি মেয়ে। দীপ্ত বলল, “মাসিমা, এই হল লু মেইহুয়া। আমরা বলি মেই। আমার সাথে ও মিউসিয়ামে কাজ করে। ও আমাদের বেইজিংটা ঘোরাবে।” সাতসকালে এমন এক অনাহুতকে দেখে প্রজ্ঞাদেবী ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “বাবা দীপ্ত, আবার অন্য মানুষ কেন? আমরা দুজনেই তো ঠিক ছিলাম।” দীপ্ত হেসে বলল, “চিন্তা করবেন না। মেই প্যালেস মিউসিয়ামের রেজিস্টার্ড গাইড। ও ভালো ইংলিশ বলে।” মেই হেসে এগিয়ে এসে বলল, ” আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম। অনেক গল্প আমি জানি, বইয়ের পাতার বাইরের। আপনার মজা লাগবে।” পরবর্তী ৭ দিন মেই ভালোই ঘোরাল। সে নিজেও চিং সাম্রাজ্য নিয়ে পড়াশুনো করেছে। ফরবিডেন সিটির এত গল্প জানে, যে সব বলতে গেলে আর একটা ভ্রমণকাহিনী হয়ে যাবে। মেই যখন জানল প্রজ্ঞাদেবী ইতিহাসের গবেষক এবং শানক্সির মেইডেন হেয়ার গাছ দেখতে এসেছেন, সে তো খুশি হয়ে বলেই দিল, ” চানগান থেকে কাছে পড়বে গাছ টা। ওখানেই আমাদের বাড়ি। আপনি আমাদের গেস্ট। আমি মাকে বলে দেব।” প্রজ্ঞাদেবীর কোনও ওজর আপত্তি চলল না। অতঃপর অষ্টমীর দিন ওনারা শানক্সির চানগানের দিকে চললেন। দীপ্ত রয়ে গেল বেইজিঙে। প্রজ্ঞাদেবীর মন পড়ে কলকাতায়। বছর পাঁচেক আগেও এইদিনে কতো হইচই হত। রাহুল, রাতুল, মিত্রা, বউমা, জামাই, নাতি-নাতনি নিয়ে জমজমাট সংসার হত পুজোর কটা দিন।

চানগানের লুয়ানঝেনে মেইর বাড়ি। ওর মা গাও রুও থাকে শুধু বাড়িতে। কাঠের বেশ বড়ো একটা তিনতলা বাড়ি। একতলায় একটা রেস্তরা চালায় রুও। দোতলায় মা মেয়ের থাকার জায়গা। আর তিনতলায় দুটো বড়ো রুম, সামনে খোলা ছাদ সুদ্ধ। প্রতিটি রুমে সুন্দর করে গোছান। রুও বলেই দিল, “আমি ভালো করে রান্না করে দেব। আপনার যা দরকার ইন্টারকমে বলে দেবেন।” ব্যবস্থাটা বেশ সুন্দর। প্রজ্ঞাদেবী বেশ অভিভূত হলেন এরমধারা থাকাতে। মনে পড়ে, গৌতম যখন ঘোরাতে নিয়ে যেত, তুলোয় মুড়ে রাখত তাকে। বাড়ির অন্য বউরা আড়ালে বলত, “আদিখ্যেতা।” আজ যদি লোকটা জানত তার আদরের পারুল এরমভাবে অন্যকারুর ঘরে থাকছে, অনর্থ করে দিত। তাং সাম্রাজ্যের ওপরও বেশ দখল আছে মেয়েটার। শানক্সির ৬ দিন ওনার মনটাকে ভুলিয়ে দিল পুরো। মেই ওনাকে তাংদের ঐতিহাসিক স্থান দেখায়। রুও ওনাকে ডাম্পলিং বানানো শেখায়। তিল তেলে মিষ্টি ভাজে দুজনে। যদিও এই ঘরে হোটেলের বৈভব নেই, তবে আরাম আছে। কলেজে মার্ক্সবাদে এসবই ওদের প্রভাবিত করত না? মেই আর রুও বলেছে একদম পূর্ণিমার দিন মেইডেন হেয়ার গাছ দেখতে যেতে।

প্রজ্ঞাদেবীর এই প্রথম যেন মনে হচ্ছে তিনি ছুটি কাটাচ্ছেন। কোনও তাড়া নেই সাইট সিএংর। কোনও তাড়া নেই বার বার ছবি তোলার। কোনও চিন্তা নেই তিনটে সন্তানকে আগলাবার। হয়তো দশমীতে মায়ের বিসর্জনের সাথে সাথে বসুদের বাড়ির বড়ো বউয়েরও বিসর্জন বোধহয় হয়ে গেছে। মৈত্র বাড়ির ছোট মেয়েটাও বিসর্জিত অনেকদিন। তিনি শুধু প্রজ্ঞাপারমিতা এখন। আজ তো আবার বিকেলে রুও দোকান বন্ধ করে শপিং করাতে নিয়ে গেল। ঝুড়ি ঝুড়ি জিনিষ কিনলেন দুজনে মিলে। আজ ওনার খরচের হিসেব নেওয়ার কেউ নেই। রাতের বেলা ফিরে দেখেন দুজনে দরজার সামনে একজোড়া জুতো। পুরুষমানুষের। অপরাধী মুখ করে মেই জানায় একজন বয়স্ক লোক এসেছেন আমেরিকা থেকে। প্রজ্ঞার পাশের রুমে। রুওকে আশ্বস্ত করে প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আহা, কোনও অসুবিধে নেই। আমি তো আর দুদিন পর দেশে ফিরে যাবো। তোমরা শুধু কাল একটা গাড়ি দেকে দিও মেইডেন হেয়ার যাবার জন্য।” রাতে শোয়ার সময় একটা চাপা অস্বস্তি হল তাঁর। লোকটার উপস্থিতি ঠিক ভালো লাগছে না তাঁর।

ক্রমশঃ (To be continued)