Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৬)

পরেরদিন একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠলেন ইন্টারকমের আওয়াজে। মেই ফোনে বলল, “আপনার শরীর ঠিক আছে? আপনি আজ রুমেই থাকুন। আমি ব্রেকফাস্ট টেবিল নিয়ে ওপরে আসছি।”
এলাহি আয়োজন ছিল ব্রেকফাস্টে। ছোট বাটিতে আদা দিয়ে ওয়ান্টন স্যুপ, মাংসের পিঠে, ছোট বাটিতে মেইফুন, একটা চৌকোণা অমলেট, কিছু সব্জি দিয়ে বানানো একটু ভাজা, ছোট বাটিতে ভাতের ওপর বাঁধাকপির আচার, তিলের নাড়ুর মতো দেখতে মিষ্টি।
প্রজ্ঞা দেবী বললেন, “একি! এত কে খাবে মেই?” মেই মিষ্টি হেসে বলল, “আপনি।” প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আমি তো আমিষ খাই না অনেকদিন।” পাকা গিন্নির মতো স্যুপে ফুঁ দিতে দিতে মেই বলল, “আজ খান। আপনার শরীরে জোর আসবে। মা এগুলো স্পেশালি আপনার জন্য বানাল।”
প্রজ্ঞাদেবী বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না যে তিনি বিধবা বলে আমিষ ছেড়ে দিয়েছেন। সংসারের চাপে লোকাচারের বিরোধিতা করা ঐ মেয়েটা মরে গেছে। তিনি সারাটা জীবন স্বামীর মঙ্গলকামনায় উপোষ করেছেন। অবশ্য মাঝখানে গৌতম টুক করে জল সাবু খাইয়ে দিত তাঁর হাজার বারণ সত্ত্বেও। ভক্তি করে ঠাকুরের কাছে মাথা নুইয়েছেন। মেয়ে আর ছেলেদুটোর জন্য পুজোপাঠ, জ্যোতিষের পাথর, বিয়ের আগে কুষ্ঠীবিচার কিচ্ছু বাদ রাখেননি। সারাজীবন মনে হয়েছে যদি তাঁর কৈশোর যৌবনে কেউ যদি একটা নীলার আংটি পরাত কি শ্বেতবেড়েলার মূল, তাহলে হয়ত জীবনে একটা বীভৎস দাগ থাকতো না। কিন্তু মেয়েটার মুখ চেয়ে মানা করলেন না। চুপচাপ খেয়ে নিলেন সবকটা।
মেই বলল, “একটা কথা ছিল ম্যাম, আজ কিন্তু ঝড় হতে পারে। খবরে বলেছে। সন্ধ্যের দিকে হবে। কাল আপনার ফ্লাইট ডিলে হতে পারে একটু। পারলে আজ দুপুরে মঠে চলে যান। আপনার পাশের রুমের লোকটা তো অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে ঘুরতে।” প্রজ্ঞাদেবী বললেন, “আচ্ছা। আজ বিকেলে শপিং ও করে নেব।”

বিকেলের পড়ন্ত বেলায় প্রজ্ঞাদেবী বাজার ঘুরে আরও কিছু গিফট নিলেন রুও আর মেইর জন্য। সারাদিন মন উচাটন হচ্ছে তাঁর। আকাশ গম্ভীর হতে শুরু করেছে। আর তাঁর মনে ঝড় চলছে কাল রাত থেকে। ৩২ বছর পর সিদ্ধার্থর সাথে দেখা হওয়াটা তাঁর এখনও হজম হচ্ছে না। কতো রাত তিনি কেঁদেছেন একটা সময়ে সিদ্ধার্থকে এক ঝলক দেখার জন্য। কত প্রার্থনা করেছেন যেন চোখ খুললে দেখেন, কোনও মন্ত্রবলে, সিদ্ধার্থ তাঁর পাশে দুষ্টুমি মাখা চোখে তাকিয়ে। কতোবার ব্যর্থ কল্পনা করেছেন ওর ঘুমন্ত মুখটা। তখন সেসব কিছুই পূর্ণ হয়নি। তাহলে আজ জীবনসায়াহ্নে কি করতে এলো সে? আইপডে গান বাজছে, “পুরনো সেইদিনের কথা।”

প্রজ্ঞা ক্লাসে বসে মন শক্ত করছে। সেদিনের পর দুদিন কেটে গেছে। কোনও লেকচার কানে ঢুকছে না। এক্সামের আর দুমাসও নেই। পাশ থেকে অসীমা ফিসফিস করে বলল, “গৌতমদার ওপর থেকে পুলিশ কেস তুলে নিয়েছে। বাড়িতে চলেও গেছে। তুই পারলে একবার দেখা করিস।”
জলে পড়ে থাকা মানুষ যেমন খড়কুটো ধরে বাঁচতে চায়, সেও সেই মুহূর্তে গৌতমকে হ্যাঙলার মতো অবলম্বন করতে চাইল। সন্ধ্যেবেলা সে যখন বাস থেকে নামলো, তলপেটর কাছে কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। মন শক্ত করতে চাইল প্রজ্ঞা একটুক্ষণের জন্য। গলার কাছটা শুকনো লাগছে তার। মনকে প্রবোধ দিল, ‘এত অপরাধবোধের কিছু নেই। গৌতম বন্ধু মাত্র। বন্ধুর কাছে সঙ্কোচের কিছু নেই।’ রাজা রাজবল্লভ স্ট্রীটের পাড়াটা চলছে নিজের তালে। বাড়ি থেকে কাঁসর ঘণ্টার আওয়াজ ভেসে আসছে। হাতে লেখা চিরকুট মিলিয়ে একটা বাড়িতে কড়া নাড়ল জোরে। উত্তেজনায় হাত কাঁপছে। একটি অল্পবয়সি স্কুলপড়ুয়া ছেলে দরজা ফাঁক করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে?” ছেলেটির চোখে সন্দেহ। পুলিশের চর নয়তো?
গলা খাঁকরে প্রজ্ঞা বলল, “নমস্কার। আমি প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র। গৌতমের জুনিয়র। দেখা করতে এসেছি একটু।”
কি ভেবে ছেলেটি বলল, “আসুন। বাইরের বৈঠকখানায় বসুন।”
কাঁপা কাঁপা পায়ে প্রজ্ঞা বৈঠকখানায় এসে বসল। সিদ্ধার্থর স্টাডির মতো বৈভব নেই; স্নিগ্ধতা আছে। ওকালতির বইও আছে সাহিত্যের পাশাপাশি। একটু পর ছেলেটি নেমে এসে বলল, “আসুন। দাদা ডাকছে ওপরে।” বড়ো একান্নবর্তী পরিবারের রাজপ্রাসাদের টানা বারান্দা পেরিয়ে যাচ্ছে সে। প্রাসাদই বটে বাড়িটা তার নিজের বাড়ির তুলনায়। দোতালার দক্ষিণের দিকের একটা ঘরে দেখল, গৌতম আধশোয়া হয়ে বসে আছে। প্রজ্ঞাকে দেখে মুখে ওর হাসি খেলে গেল। বলল, “ভাই, আমাদের একলা ছেড়ে দে একটু। দরজা টেনে দিস। অন্য কেউ যেন এখন আমাকে বিরক্ত না করে।”
ছেলেটি ঘাড় নেড়ে, দরজা টেনে চলে গেল।

প্রজ্ঞাকে বলল, “এসো। কাছে এসে বস। ও আমার জ্যেঠুর ছোটছেলে সৌরভ। আজকাল একটু কানে শুনতে সমস্যা হয়। ডাক্তার বলছে সেরে যাবে।” শুকনো মুখে প্রজ্ঞা এসে গৌতমের পালঙ্কে ওর পায়ের কাছে বসল। এই প্রথম ওর নাকে একটা অন্য রকম পুরুষালি গন্ধ এলো। দেখতে লাগলো গৌতমের শরীরটা। ব্যায়াম করা সুঠাম চেহারাতে মেদ জমেছে একটু। পাঞ্জাবির ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে একা রোমশ বুক। প্রশস্ত কাঁধের ওপর ব্যান্ডেজ জড়ানো। স্নিগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে গৌতম। নৈঃশব্দ্য ভেঙ্গে গৌতম বলল, “কি দেখছ পারুল অমন করে?”
প্রজ্ঞা চমকে তাকাল ওর দিকে। ওর স্বরে আগেও এমনি আদর মেশানো থাকতো?
সে বলল, “আমি বড্ড বোকা ছিলাম গো। তুমি জানতে সেদিন পুলিশ আমাদের মিছিলে লাঠিচার্জ করবে?”
গৌতম বলল, “হ্যাঁ। তোমার পড়া কেমন চলছে?”
শুকনো গলায় উত্তর এলো, “ভালো।”
তারপর একটা অসহ্য নীরবতা নেমে এলো গোটা ঘরে। শুধু দেওয়াল ঘড়িটা টিক টিক করে চলছে।

এমনি সময়ে প্রজ্ঞা বলে উঠল ব্যাকুল হয়ে,”আমি সিদ্ধার্থর সন্তানের মা হতে চলেছি। ওকে খবর দাও প্লিজ।”
গৌতমের মুখ দিয়ে বাক্যস্ফূর্তি হল না। অস্ফুটে বলল, “মানে?”
“সিদ্ধার্থ গত জানুয়ারির শেষের দিকে এসেছিল আমার কাছে। রাতে দেখা হয়েছিল। আমি তখনই……।”, কথা শেষ হওয়ার আগেই কাঁদতে কাঁদতে গৌতমের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল প্রজ্ঞা।
গৌতম চুপ করে বসে।
আর প্রজ্ঞা তার এতদিনের কান্না আজ উজাড় করে চলেছে।
দেওয়াল ঘড়ি একঘেয়ে সুরে টিকটিক করে চলছে। যেন মহাকালের প্রতিনিধি হয়ে ওদের সাক্ষী থাকছে। এমনি করে ঢং ঢং করে আটটা বেজে উঠল।
গৌতম বলল, “তুমি জানো সিদ্ধার্থ কোথায়?”
প্রজ্ঞা চোখ তুলে তাকাতেই বলল, “ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে ও ধরা পড়ে মালদায় গঙ্গা পেরতে গিয়ে। নক্সালের খাতায় নাম লিখিয়েছিল বহুদিন। আমরা জানতাম না। ওকে ওইদিন পুলিশে খুব মারে। তারপর কলকাতায় চালান করা হয় ওকে। ওর বাবা আইন ঘেঁটে, মুখ্যমন্ত্রীকে ধরে, ওকে রাজসাক্ষী করে বিদেশে পাঠায় গত মাসে। খুব সম্ভবত ও এখন প্যারিসে। ওকে ওখান থেকে অগাস্টে বার্লিনে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যতদিন না রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় ও ফিরবে না।”
প্রজ্ঞা স্তম্ভিত হয়ে সব কথা শুনে যাচ্ছিল। গৌতমের কথা গুলো যেন কান কেটে ওর মস্তিস্কে ঢুকছিল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল, “কি বললে?”
গৌতম বলল, “আগামী পাঁচবছরের আগে ও ফিরবে না। পিএইচডি শেষ করে ফিরবে।”
হঠাৎ প্রজ্ঞার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। এই স্বার্থপরের জন্য ও নিজের সম্ভ্রম খুইয়েছে? এই লোকটাতে সে ভালবেসেছে? এর জন্য নিজের পড়াশুনো বিসর্জন দিতে বসেছিল? ঘোর লাগা গলায় বলল, “আমি ডাক্তারের কাছে যাবো এখনই। আমি এই সন্তানকে চাই না। হয় এ শেষ হবে নয়তো আমি।”
প্রেতিনীর মতো উন্মত্ত হয়ে প্রজ্ঞা দরজার দৌড়ে যেতেই গৌতম ওকে পেছন থেকে আটকায়। জাপটে ধরে নিজের মধ্যে। প্রজ্ঞার মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে, “পারুল আজ বাড়ি যাও লক্ষ্মীটি। ঠাণ্ডা হও। আর একটি মাস সময় দাও আমাকে। তোমার অসম্মান হতে দেব না। তুমি শুধু পরীক্ষাটা দিয়ে দাও মন দিয়ে। ”

সে রাতে সৌরভ ট্যাক্সি করে প্রজ্ঞাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। এক মাস পর গৌতম ওর বাড়িতে নিজে এসে বিবাহ প্রস্তাব দেয়। তখন ওর রোজগার বলতে দুটো টিউশনি। দাদাদের অমতে, গৌতমের বাড়ির বিরোধিতার মাঝেও গৌতম তাকে বিয়ে করে। বিয়ের কয়েক মাস পরই ফলপ্রকাশ হয়। প্রজ্ঞা ক্লাসে প্রথম হয়। তাকে গৌতম ভর্তি করে মাস্টার্সে । আর তার মাস ছয়েক পর সে জন্ম দেয় এক ডাকসাইটে সুন্দরী শিশুকন্যার। প্রজ্ঞার মতো পটলচেরা চোখ আর সিদ্ধার্থর মতো টিকালো নাক।
মেয়েকে কোলে নিয়ে ক্লান্ত স্বরে সে বলে, “সঙ্ঘমিত্রা।”
গৌতম শুধোয়, “ও কি তাই চেয়েছিল?”
ঘুম জড়ানো স্বরে সে বলে, “হ্যাঁ।”
মেয়েকে কোলে গৌতম উচ্ছ্বাসে বলে ওঠে, “সঙ্ঘমিত্রা বসু। আমাদের প্রথম সন্তন। এই বাড়িতে প্রথমসন্তান মেয়ে কোনোদিন হয়নি। এ আমাদের লক্ষ্মী।”

সত্যই সে লক্ষ্মী। তার জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গৌতম পাশেই একটা স্কুলে চাকরি পায় ভূগোলের শিক্ষকের। শুধু সৌন্দর্য আর ভাগ্যের জোরে তার জন্মের অবৈধতার কথা চাপা পড়ে যায় ক্রমশ। সে তার বাকি দুই ভাইয়ের থেকে অনেক মেধাবী, অনেক যোগ্য। সে তার বাবার গর্বের বস্তু। গৌতমের মাত্রাছাড়া প্রশ্রয়ে বড্ড স্বাধীনচেতা হয়েছে সে।
অথচ তাকে নিয়ে প্রজ্ঞার অস্বস্তি কোনোদিন যায়নি। কিসের এত অহঙ্কার ছিল গৌতমের, নিজের স্ত্রীর অবৈধ সন্তান নিয়ে? কি প্রমাণ করতে চাইত? সে মহান? নাকি বন্ধুর প্রতি কর্তব্য? অস্বস্তি আজও পিছু ছাড়েনি তাঁর। জানলা দিয়ে দেখলেন আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। হাল্কা করে ঠাণ্ডা হাওয়া দিতে শুরু হয়েছে।

আগামী পর্বে সমাপ্য (Next part will be the last part)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s