Posted in Story

লিভিং ফসিল (পর্ব ৫)

সে রাতে কিছুতেই ঘুমোতে পারলেন না প্রজ্ঞাদেবী। এভাবেও মানুষ ফিরে আসে? ৩২ বছর পরে? তাঁর আইপডে গান বাজছে, ‘আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী’।
১৯৭৩ সালে মানু রায় ক্ষমতায় চলে এসেছে। নক্সাল আন্দোলন তখন তুঙ্গে। পুলিশ রোজ শুটআউট করছে। প্রবীরের লাশ উদ্ধার হল গড়ের মাঠ থেকে। সুনিতা ইন্টারোগেশনের চোটে পাগল হয়ে গেছে। কলেজের দেয়ালে পোষ্টার পড়ে, ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান।’ প্রজ্ঞা সব কিছুতে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। সে ততদিনে ফাইনাল ইয়ার স্টুডেন্ট। আজ ৪ মাস সিদ্ধার্থের দেখা নেই। রাগ জমে। অভিমানে ওর গলা বুজে আসে।
“দ্যাখো পারমিতা। অতো ভেব না। ও এরমই ক্ষ্যাপাটে বরাবর।”, চায়ে চুমুক দিতে দিতে গৌতম বলে।
“কিন্তু এরমভাবে না বলে উধাও হওয়াটা কোন দেশি সভ্যতা গৌতম?”, প্রজ্ঞা বিরক্ত। কফি হাউসে মান্না দের গান বাজছে।
“দ্যাখো পারমিতা, তোমার পড়াশুনোয় মন দাও। সেকেন্ড ইয়ারে ৫০% মার্কস তুলেছ। এগুলো কি হচ্ছে?”
“সে তোমায় নিতে হবে না। কিন্তু মানু রায়ের টর্চারও নেওয়া যায় না।”
“নিতে হবে না। তুমি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িও না। এটা ফাইনাল ইয়ার। প্লিজ, ৬০% র ওপর মার্কস আনো।”
“ছিঃ গৌতম! তুমি বামপন্থী হয়েও আমাকে বলছ শ্রেণীশত্রুকে পিঠ দেখাব?”, প্রজ্ঞার গলায় ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে।
“হ্যাঁ, বলছি। তুমি মেধাবী। আমি চাই না গড়ের মাঠ থেকে তোমারও লাশ উদ্ধার হোক। আমি চাইনা তোমার মেধাটা নষ্ট হোক।”, অজান্তে গৌতমের গলাটা চড়ে যায়।
“অসভ্যের মতো চেঁচিয়ো না গৌতম।”, প্রজ্ঞারও গলাটা ওঠে।
“তুমি এই রোববারের মিছিলে যাবে না; ব্যাস।”, ছায়ের কাপটা নামিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে গৌতম।
“তুমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কে?”, প্রজ্ঞা উদ্ধত হয়ে ওঠে।
“আমি ইউনিয়ন লিডার, কমরেড গৌতম বসু।”, রায় শুনিয়ে দেয় সে।
থম্থমে মুখে প্রজ্ঞা বসে থাকে। কফি জুড়িয়ে যায়। ফিশফ্রাই ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

সেই রোববারটা ছিল অসহ্যরকম দীর্ঘ। খবর এসেছিল, রাইটার্সের সামনে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। লাঠি চার্জ, জলকামানও চালানো হয়েছে মিছিলের ওপর; যে মিছিলের পুরোভাগে ছিল গৌতম। দাদারা তাকে ঘরবন্দী রেখেছিল। সারাদিন প্রজ্ঞা ছটফট করেছে। সিদ্ধার্থ নেই পাশে। যদি গৌতমের কিছু হয়? পরেরদিন খবর কাগজে বেরোল সেই মিছিলে ১০ জন নিহত, ৩০ জন গুরুতর আহত। আহতরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি। গৌতমের রক্তাক্ত ছবি ছিল প্রথম পাতায়। প্রজ্ঞা আছন্নের মতো ক্লাসরুমে বসে থাকে। গৌতম তাকে এভাবে বাঁচালো?!
ক্যান্টিনে অনীশ এসে খবর দেয়, “প্রজ্ঞাদি, গৌতমদা ভালো আছে মোটামুটি। খবর পেয়েছি।”
প্রজ্ঞা ওর হাত চেপে ধরে বলে, “আমাকে নিয়ে চল।”
অনীশ বলল, “পাগল নাকি? গেলেই সাদা পোষাকে থাকা পুলিশ ধরবে। তুমি আজ বাড়ি যাও।”
সেই মুহূর্তে বড়ো শীত করছিল প্রজ্ঞার; বড়ো অসহায় বোধ করছিল ও।

এই ঘটনার পর একমাস কেটে গেছে। সে বড়ো শান্ত হয়ে গেছে। প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরিয়ে নিয়েছে নিজেকে।কেবল উদ্বাস্তুদের সাহায্য করাটা বন্ধ করেনি। গৌতম হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে গেছে। কিন্তু ওর ঘোরাফেরা বারণ। নক্সাল সন্দেহে প্রায়ই পুলিশের চর সাদা পোষাকে ওদের গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। সিদ্ধার্থর সাথেও তেমন দেখা হয় না। সর্বদা ও যেন ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত। ওর বাবা শাসক ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ছেলের অবাধ ঘোরাফেরায় বাধ সেধেছেন। নক্সালদের লিস্টে বাপ-বেটার নাম ওঠার ভয় তো আছেই। মাঝে মাঝে নিজের ডেস্কে অনামি খামে সিদ্ধার্থর চিঠি পায়। কিন্তু তাকে এখন আর কিছুই স্পর্শ করে না। ওর সামনে পরীক্ষা । গৌতমতো এটাকেই তো পাখির চোখ করতে বলেছিল। মাঝে মাঝে একা ঢাকুরিয়া লেকে বসে থাকে। সিদ্ধার্থর মুখটা আবছা হয়ে যাচ্ছে কি? ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে মাঝে মাঝে। ওর শরীর উন্মুখ হয়ে থাকে সিদ্ধার্থর ছোঁয়ার আশায়। মনে পড়ে সিদ্ধার্থর ঘামে ভেজা গায়ের গন্ধটা, ওর চোখ, ওর টিকালো নাক; সর্বোপরি ওর আগুনের মতো সর্বগ্রাসী ভালোবাসাটা। সব মিলিয়ে গেছে ওর জীবন থেকে। প্রজ্ঞাপারমিতা মৈত্র স্তিমিত হয়ে গেছে।

ক্রমে সময় কেটে যায়। আরও ৪ মাস অতিক্রান্ত। সংসার বড়ো হয়েছে। বড়দার স্ত্রীবিয়োগ হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুকালে একটি ছেলের দায় চাপিয়ে গেছেন। মেজদা ও সেজদার একমাসের ব্যাবধানে পর পর বিয়ে হল। ছোড়দা চলে গেছে বম্বে চাকরি নিয়ে। প্রতিমাসে নিয়ম করে খামে করে টাকা আসে। বাবারও অবসরের সময় হয়ে এল। সব কথা ভেবেই টালিগঞ্জের বাড়িটা দোতালা করা হয়েছে সদ্য। এখনও বাইরেটা চুনকাম করা বাকি। প্রজ্ঞার পড়ার কথা ভেবে ছোড়দার পরামর্শে ছাদে একটা সুন্দর শৌখিন ঘর বানানো হয়েছে। প্রজ্ঞা পারতপক্ষে ঘর ছেড়ে বেরয় না। গ্র্যাজুয়েশনের পর সে কি করবে ভাবতে থাকে। সেজদার শ্বশুরবাড়ির দিকে কয়েকটা সুযোগ্য পাত্র আছে। সিদ্ধার্থর তরফে আর কোনও যোগাযোগ নেই। এমনি এক শেষ জানুয়ারির রাতে প্রজ্ঞার দরজায় টোকা পড়ে। ঘড়িতে তখন রাত ১১ টা। সে অবাক হয়। ভাবে মেজবৌদি যদি এই সময় যদি রসের গল্প করতে আসে তাহলে সে দুকথা শুনিয়ে দেবে। এসব সাত পাঁচ ভেবে দরজা খুলতেই চমকে উঠল ও।

একি সামনে কে দাঁড়িয়ে? সিদ্ধার্থ না? একি চেহারা হয়েছে? একমুখ দাড়ি। মাথার চুল রুক্ষ হয়ে গেছে অযত্নে। গায়ের রঙ পুড়ে গেছে পুরো। জামা কাপড় শতচ্ছিন্ন। স্তব্ধ হয়ে গেল প্রজ্ঞার হৃদয়। আচমকা ওকে জড়িয়ে ধরে সিদ্ধার্থ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে। কানে কানে বলে, “কিছু খেতে দিতে পারবে গো? চারদিন ধরে শুধু জল আর মুড়ি খেয়ে আছি।” চোখ ফেটে জল এল প্রজ্ঞার। অতো বড়লোক বাড়ির অতো আদরের ছেলে আজ এতদিন অভুক্ত। বলল, “দাঁড়াও একটু।” সিদ্ধার্থ ওর হাত ধরে বলল, ” শোনো, আস্তে করে যেও। তোমার পাশের বাড়িতে পুলিশের চর এসেছে আজ ৭ দিন।” প্রজ্ঞার বুক হিম হয়ে যায় শুনে। আস্তে আস্তে করে নিচের রান্নাঘরে নেমে মিটসেফ খুলে পায়, রুটি, একটু তরকারি, অল্প ডাল আর দুটো অমৃতি। তাইই নিয়ে ছাদে উঠে আসে সে। গোটা পাড়াটা শীতে নিস্তব্ধ। কেউ জেগে নেই। বুভুক্ষুর মতো সিদ্ধার্থ তাই খেল পশুর মত। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে প্রজ্ঞা বলল, “ধীরে ধীরে খাও।”
সিদ্ধার্থর খাওয়া হলে ঐ থালাতেই আঁচিয়ে দিল। হঠাৎ বাইরের রাস্তায় কারুর পায়ের আওয়াজ মনে হতেই প্রজ্ঞা চট করে আলো নিবিয়ে দিল। হারিকেনের শিখাটা খুব কমিয়ে দিয়ে সিদ্ধার্থের মুখটা নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে দিল। স্পষ্ট বুঝতে পারছে সে, সিদ্ধার্থ ভয়ে কাঁপছে। এমনি করে কিছুক্ষন কাটার পর প্রজ্ঞা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। হারিকেনের আলোয় সিদ্ধার্থ দেখতে পেল, এক অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারিণী তার প্রেমিকা। সে রূপ অসম্ভব স্নিগ্ধ, অসম্ভব পবিত্র। তার মনে হল সে যদি তার প্রেমিকাকে ছোঁয়, হয়ত তার পাপ হবে। তাও সে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর। আজ রাতটুকুই তো সম্বল। তারপর যদি দেখা না হয়? প্রাণপণে ওর ঠোঁট থেকে শুষে নিতে থাকল প্রাণশক্তি, “আহ মিতা, তোমাকে কতদিন পাইনি কাছে।” প্রজ্ঞার আঁচল মাটিতে লুটোচ্ছে। সিদ্ধার্থ নগ্ন মুহূর্তকালে। সে বুঝতে পারছে, পিঠে আঁচড় কাটছে প্রেয়সীর নখ। সে আরও কাছে চেপে ধরে তাকে। আরও কাছে টেনে আনে। দুটো শরীরে শঙ্খ লাগে প্রথমবার, নিঃশব্দে।
রমণ শেষে প্রজ্ঞার এলোচুলে আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে সিদ্ধার্থ বলে, “মিতা, সরি।”
প্রজ্ঞাপারমিতা ভেজা গলায় বলে, “এতদিন কোথায় ছিলে তুমি?”
“আমি পার্টির নির্দেশে উত্তরবঙ্গে ছিলাম। বাড়ির সাথে সম্পর্ক নেই আর। আমার ওপর নির্দেশ আছে অনেক কাজের। মিতা কথা দাও অপেক্ষা করবে।”
“না যেও না সিদ্ধার্থ। আমি এখানে একলা। বড্ড একলা।”, প্রজ্ঞার গলায় আকুতি ঝরে পড়ে।
আলতো হেসে সিদ্ধার্থ বলে, “কেঁদো না লক্ষ্মীটি। গৌতম তোমাকে আমার সব খবর দেবে।”
“না তোমাকে চাই শুধু। এ লড়াইয়ে কোনও দিশা নেই। তোমাকে আমি হারাতে পারব না।”
“আমি ঠিক ফিরে আসব। কথা দিলাম। এখন একটু ঘুমাও।”

সেটা ছিল ওদের শেষ দেখা। তারপর সিদ্ধার্থ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। ক্রমশ এপ্রিলের শেষ এগিয়ে আসে। পরীক্ষার চাপ বাড়তে থাকে। সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে ওর অম্বল আর অরুচি। এসবের জন্য ওর মা দায়ি করে রাতজাগা আর পড়ার চিন্তাকে। এসবের মাঝে একদিন ক্লাসে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায়। সাথে উঠে আসে প্রচুর বমি। একটু সুস্থ হলে ইউনিয়নের একটি মেয়ে এসে বলে, “দিদি, আমার লক্ষন ঠিক লাগছে না। তুমি কি কারুর সাথে? মানে তুমি তো বিয়ে করনি। কথাটা খুব লজ্জার কিন্তু।” প্রজ্ঞার সময় লাগে কথাটা বুঝতে। তারপর পিঠ দিয়ে হিমস্রোত বয়ে যায়। একি কথা শুনছে সে? সে হাসবে না কাঁদবে? সে কুমারী মেয়ে আবার পেটে বাসা বেঁধেছে সিদ্ধার্থর সন্তান ! কি করবে সে?

ক্রমশঃ (To be continued)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s