Posted in Story

প্রণয় ও বিবাহ

সেদিন আমি ফোনে বকছিলাম দুগুর বাপের সাথে। সদ্য প্রেম ভাঙ্গা দেবদাসের মত আধা মদ্যপ স্বরে বলছিল, “আমার কথা কি ওর একটুও মনে পড়ে না? বিয়ে না করলেও তো বউ ভাবতাম।”
আমি ঘাড় গুঁজে তখন আমার সদ্য নতুন কচি প্রেমিককে সেলফি পাঠাচ্ছিলাম হাঁসের মত মুখ করে। সেলফি তোলা শেষ হলে বললাম, “নিজের পূর্বপুরুষকে স্মরণ কর। তোর দাদুর দাদু দুখানা বিয়ে করেছিলেন, আর তুই একটা মেয়ের শোকে পাগলে গেলি? বউ খোঁজ। সাইডে আর একটা মামনি রাখ। ”
দুগুর বাপ ক্ষেপে গিয়ে বলল, “রাখ ফোন তুই। ভালবাসাটা তুই বুঝিস না।”
আমি একটা বিশাল হাই তুলে, নতুন মুরগির কাছ থেকে একটা কমপ্লিমেন্ট নিয়ে বললাম, “মাথা ঠাণ্ডা হলে ফোন করিস।”

ঠিক এমনি সময়ে আমার ঠাকুমা, কুমুদিনী দেবী, বললেন, “মলুরে পানের বাটাটা নিয়ে আয় তো। আর তোর ধন্বন্তরি বন্ধুর সাথে কি নিয়ে লাগলো?” আমি পান, চুন, সুপারি সব সাজিয়ে নিয়ে বসে পরলাম। প্রসঙ্গত দুগুর বাপ হল ডাক্তার। আর দুগু হল তার পোষা পাগ।
বললাম, “কি আবার। ব্যর্থ প্রেমের ছ্যাঁক। সে মেয়েছেলেটাকে সামনে পেলে ওর মুণ্ডু ছিঁড়ে খাব।”
ঠাকুমা ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, “এই তোদের জেনেরেশনের প্রব্লেম। কিছু হলেই তোদের ইগো এসে যায়। কিছু ধরে রাখতে পারিস না। আর কিছু ভালো পেলে তার মর্ম বুঝিস না। তোরা তো প্রেমের বেসিক জিনিষটাই বুঝিস না। বিবাহ আর প্রণয়ের পার্থক্যটা বুঝিস?”
আমি ভ্যাবা গোবিন্দের মত মুখ করে তাকিয়ে রইলুম। পাশ থেকে মোবাইলে নোটিফিকেশন আসছে। নতুন বয়ফ্রেন্ড পাঠিয়েছে, “হট”। ঠাকুমা পান টা মুখে পুরলো।
আমি বল্লাম, “ঠাম্মা আলো দেখাও।”

ঠাকুমা বলতে শুরু করল, “বাংলা অভিধান খুলে দ্যাখ। প্রণয় মানে কি? প্রণয় মানে ভালোবাসা। প্রণয় মানে অনুরাগ। তোর যদি কাউকে ভালোলেগে থাকে, তাহলে সবসময় তুই ওর কথা ভাববি। তুই তাকে কাছে পেতে চাইবি। তার ভালোতে তোর ভালো। প্রণয়ের আগের অবস্থা কি জানিস? পূর্বরাগ।”
আমার হাঁ করে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে ঠাম বলল, “আরে তোদের ভাষায় ক্রাশ। সত্যি কি দিনকাল এল।” আমি বললাম, “দেবী। প্রসীদ ভব। আগে বল।”
ঠাকুমা বলল, “ভালোবাসা হল একটা বিশুদ্ধ জিনিষ। এটাকে কোনও বাঁধনে বাঁধা যায় না। চণ্ডিদাসের ভাষায়, ‘নিকষিত হেম, কাম গন্ধ নাহি তায়।’ এই ভালবাসায় যখন শরীর জাগে তখন সেটা প্রণয়। তুই তোর ধন্বন্তরিকেও ভালবাসিস। আবার সেই ছ্যাঁচড়া ডাক্তারটাকেও ভালবাসতিস ,তোর কলেজে। প্রথম কেসটা টা ভালোবাসা। পরেরটা প্রণয়। তোর প্রণয়ে কাম ছিল। প্রবলভাবে ছিল। ওটা খারাপ না আদৌ। কাম না থাকলে সৃষ্টি হত না। মধ্যযুগের ঘাটের মড়া মঙ্কগুলো বাইবেলে কামকে পাপ বলে দাগিয়ে দিল। আর আমরাও তাই নিয়ে নাচতে বসলাম।”
আমি বললাম, ” ঠাম্মা কিন্তু আমাদের শাস্ত্রেও তো বিবাহপূর্ব যৌনতা পাপ।”
ঠাকুমা তেতো খাওয়া মুখ করে বলল, “ওহে শাখামৃগ, আমাদের শাস্ত্রে এসব কিছু নেই। এটা কি জানিস উলুপি অর্জুনকে বলেছিল যে কামার্ত নারীর কামতৃষ্ণা নিবারন করা পুরুষের অবশ্য কর্তব্য? আমাদের শাস্ত্র কোনও পাথরে খোদাই করা জিনিষ না। যুগে যুগে বিভিন্ন টীকাকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা করেছে। তোমার যেটা ভালো লাগে সেটা ফলো কর। তবে মানুষের বিশ্বাসে আঘাত করা পাপ। আর যখন বিয়ের কথা উঠল, তাহলে বল, বিয়ের তাৎপর্য কি?”

মাথায় অনেক কিছু ঝিলিক দিল। প্রি-ওয়েডিং শুট। ডিজাইনার লেহেঙ্গা। আগ্নিমিত্রা পালের শাড়ী। মালদিভে হনিমুন। সিঁদুর নাকে পরলে ‘স্বামী সোহাগী’ হওয়ার আশা। ফরেন ট্যুর। ননদ, দেওর, শাশুড়ি, শ্বশুর এসব ভাবছি; এমনি সময় ঠক করে ঠাম্মা মাথায় মেরে বলল, “উজবুক। বিবাহ মানে বহন করা।”
আমার হাঁ করা মুখে একটা ক্যাডবেরি দিয়ে বলল, “বিবাহ মানে বি পূর্বে বসানো বহ ধাতুর ঘং। তোরা অতো বুঝবি না। সোজা ভাষায় কাউকে সারাজীবনের জন্য বিশেষভাবে বহন করাই হল বিবাহ। একটা কথা বল মলু। তোর বাবা মার সাথে কি সারাজীবন কাটাতে পারবি?’
আমি বললাম, “ঠাম, একমাত্র মেয়ে আমি। দায়িত্ব তো নিতেই হবে।”
ঠাকুমা বলল, “বাপের সামনে বসে সব বলতে পারবি? মনের গোপন ব্যাথা গুলো?”
আমি জিভ কাটলাম। ঠাকুমা বলল, “এবার বল, তোর ছেলেমেয়ে তোর সাথে সারাজীবন থাকবে?”
আমি বললাম, “মনু বলেছেন নারীর বার্ধক্যে…”
ঠাম ক্ষেপে গিয়ে বলল, “মলু চ্যাংড়ামি মারিস না।”
আমি শুকনো গলায় বললাম, “না”।
ঠাকুমা বলল, “এখানেই পতি দেবতার জয়।”
আমি বললাম, “মানে?”

ঠাকুমা বলল, “বৈদিক বিবাহে পঞ্চম মন্ত্রে বর বধূকে বলে আমি তোমার সখা হলাম। তোমার সব সুখ দুঃখের সাথী হলাম। তখন বধু তাকে আজীবন ভালোবাসার প্রতিজ্ঞা করে। দ্বিতীয় মন্ত্রে বধু চায় স্বামী আজীবন তার বিশ্বস্ত থাকুক। তৃতীয় মন্ত্রে সে নিজে প্রতিজ্ঞা করে যে সে নিজে বিশ্বস্ত থাকবে। অবশ্যই এই প্রমিসগুলো শুকনো মনে আসে না। এইখানেই প্রণয় আর বিবাহের মেলবন্ধন। ভেবে দ্যাখ মলু, এই জিনিষগুলো কিন্তু তোরা একটা ভালো সম্পর্ক থেকে আশা করিস।”
আমি বড় বড় চোখ করে বললাম, “হ্যাঁ গো। কিন্তু দুগুর বাপ তো এগুলো দিয়েছিল মেয়েটাকে। ও কি দোষ করল?” ঠাম বলল, “বাবু, প্রমিস তো একদিক থেকে হয়না রে। অতো সোজা এই ভয়ঙ্কর প্রমিস গুলো সারাজীবন টানা? মেয়েটা কি অতটাই ভালবাসত ধন্বতরি কে? মলু, আগেই বললাম প্রণয় মানে অনুরাগ। তার আগে থাকে পূর্বরাগ। পূর্বরাগ মানুষকে মোহাবিষ্ট করে। চোখে ধাঁধাঁ দেখে মানুষ। অনুরাগ হল ওই মোহ থেকে বেরিয়ে মানুষটার দোষ গুণ সব মিলিয়ে ভালোবাসা। তারপরে আসে বিবাহের প্রতিজ্ঞা। এটা ভুল বলে শাস্ত্রে, যে ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’। কথাটা হওয়া উচিৎ ‘প্রণয়ার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’। প্রণয় ভিন্ন বিবাহ যেমন অসার, তেমনি বিবাহ ভিন্ন প্রণয় অসার। যদি ভালোবাসা সত্যি থাকে, তাহলে দেখিস সে ঠিক কোনও না কোনও ভাবে তোকে নিজের করবে।”

আমি বললাম, “ঠাম, তাহলে আমার যে বন্ধুটা বলে যে আমাকে ভালবাসে কিন্তু কমিট করবে না। সেটা?”
ঠাকুমা বলল, “বোগাস। ওটা বালবাসা। শোন মলু, ভালোবাসা থাকলে সাহস থাকে তাকে আপন করার। ধন্বন্তরির ওই সাহস আছে। মেয়েটার ছিল না। সাহস না থাকলে ওই মন্ত্র পড়া যায় না অগ্নিসাক্ষী রেখে। সাহস না থাকলে লিভ ইন করা যায় না। ইনফ্যাক্ট সাহস না থাকলে ভালবাসা যায়না বাবু। এটা ঠিক বিবাহের অবশ্যম্ভাবী ফল হল সন্তান। সেই সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে গেলে তার মা বাবার মধ্যে সুসম্পর্ক রাখাটা আবশ্যক। অসুস্থ পরিবেশে দানব জন্ম নেয়। আর সেই সুসম্পর্কটা আসে প্রণয় থেকে। বুঝলি? এখন পালা। আমি ঘুমাব। আর হ্যাঁ, ধন্বতরিকে বলিস লিচু পাঠাতে।”

আমি আস্তে করে ঠাকুমার ঘর থেকে বেরিয়ে ফোন লাগালাম, “হ্যালো, দুগুর বাপ। তোর ম্যাগাজিনের নেক্সট লেখা রেডি। আর শোন, প্রেম বারবার আসবে। জয় মা বলে ঝুলে পড় নতুন করে।”
দুগুর বাপ বলল, “ওটিতে ঢুকব। রাখ ফোন এখন বোকাচোদা। লেখাটা পাঠাস।” তারপর আর কি? নতুন প্রেমিককে দুটো চুমু পাঠিয়ে লিখতে বসলাম।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s